কম্পিউটারটেকনোলজিপড়াশুনাশিক্ষাসফটওয়্যার

সফটওয়্যার কি? সফটওয়্যার এর প্রকারভেদ

বাংলাদেশ সহ বিশ্বের অনেক দেশেই কম্পিউটার বলতে শুধু কম্পিউটারের হার্ডওয়্যারকেই চেনে। কিন্তু কম্পিউটার ব্যবহারের ক্ষেত্রে কম্পিউটারের হার্ডওয়্যার তথা যন্ত্র গুলো যতটুকু ভূমিকা পালন করে, ঠিক ততটুকুই ভূমিকা পালন করে কম্পিউটারের সফটওয়্যার। কম্পিউটার চালনায় দক্ষ হওয়া মানেই হলো কম্পিউটারের সফটওয়্যার গুলো পরিচালনায় দক্ষ হওয়া। কিন্তু কম্পিউটারের সফটওয়্যার ঠিক কত প্রকার, কি কি এবং সেগুলো কিভাবে একটি আরেকটির সাথে সম্পর্কযুক্ত তা জানি না আমরা অনেকেই। আর তা না জানলে কম্পিউটার চালনায় সর্বোচ্চ দক্ষতা অর্জন যে রয়ে যাবে একটি অলীক স্বপ্ন, তাও বলার অপেক্ষা রাখে না। আর তাই এই লেখায় তুলে ধরা হয়েছে সফটওয়্যার কি, তার প্রকারভেদ এবং সেসব সম্পর্কিত বিস্তারিত। 

সূচিপত্রঃ

সফটওয়্যার কি? 

সফটওয়্যার হলো কিছু প্রোগ্রাম, নির্দেশনা এবং তার সাথে সম্বনিত ডাটা এর সমষ্টি যার সাহায্যে কম্পিউটার নির্দিষ্ট এক বা একাধিক কাজ সম্পন্ন করে থাকে। মূলত কম্পিউটারের মেমোরি ও বিভিন্ন সার্কিট বোর্ডে সংরক্ষিত যেসব নির্দেশনার উপর ভিত্তি করে কম্পিউটারের হার্ডওয়্যার গুলো তাদের সকল কাজ সম্পন্ন করে, তাই সফটওয়্যার। 

সফটওয়্যার ধরা যায় না, ছোয়াও যায় না। কিন্তু আমরা কম্পিউটারের মনিটরে যা কিছুই দেখি, তা সবই কোনো না কোনো সফটওয়্যারের ফল। মূলত একজন মানুষ কম্পিউটারে যাই ইনপুট দিয়ে থাকুক না কেন, সেটির ফলাফল বা আউটপুটটি আসে কোনো না কোনো সফটওয়্যারের মাধ্যমে। সেটি হতে পারে সাধারণ একটি অক্ষর টাইপ করা থেকে শুরু করে অসম্ভব জটিল প্রোগ্রাম তৈরি করা। 

সফটওয়্যারের প্রকারভেদ 

সফটওয়্যারের জগতটি যেমনই বৃহৎ তেমনি জটিল একটি জগত। আর এই সফটওয়্যারের প্রকারভেদ যেমন রয়েছে, ঠিক তেমনি সেই প্রকারভেদ এরও আবার ধরন রয়েছে। সফটওয়্যার প্রকারভেদ গুলোও নানা কিছুর উপর ভিত্তি করে করা হয়। এই লেখাতে মূলত তিনটি ধরনের উপর ভিত্তি করে সফটওয়্যার গুলোকে প্রকারভেদে বিভক্ত করা হয়েছে।

ভিত্তি

প্রকারভেদ 

উদাহরণ 

কাজের ধরন  ১। সিস্টেম সফটওয়্যার (System Software) 
  • অপারেটিং সিস্টেম (Operating System) 
  • ডিভাইস ড্রাইভার (Device Driver) 
  • ফার্মওয়্যার (Firmware) 
  • ইউটিলিটি সফটওয়্যার (Utility Software)
  • প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ ট্রান্সলেটর (Programming Language Translator)
২। অ্যাপ্লিকেশন সফটওয়্যার (Application Software) 
  • ওয়ার্ড প্রসেসর (Word Processor) 
  • গ্রাফিক্স সফটওয়্যার (Graphics Software) 
  • মাল্টিমিডিয়া সফটওয়্যার (Multimedia Software)
  • ওয়েব ব্রাউজার (Web Browser) 
উৎস (Source)  ১। ক্লোজড-সোর্স সফটওয়্যার (Closed-Source Software) 
  • কমার্শিয়াল সফটওয়্যার (Commercial Software)
  • শেয়ারওয়্যার (Shareware)
  • ফ্রিওয়্যার (Freeware) 
২। ওপেন-সোর্স সফটওয়্যার (Open-Source Software) 

সিস্টেম সফটওয়্যার (System Software)

সিস্টেম সফটওয়্যার হলো এমন এক ধরনের সফটওয়্যার যা অন্য সফটওয়্যারের জন্য একটি ভিত্তি হিসেবে কাজ করে এবং ব্যবহারকারী ও অন্যান্য সফটওয়্যারের সাথে হার্ডওয়্যারের যোগাযোগ স্থাপন করে।

সিস্টেম সফটওয়্যার মূলত হার্ডওয়্যারের সাথে মানুষের যোগাযোগ স্থাপনকারী হিসেবেই পরিচিত। কম্পিউটারের প্রতিটি হার্ডওয়্যারই পরিচালিত হয় সিস্টেম সফটওয়্যারের মাধ্যমে। হার্ডওয়্যার ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে অন্যান্য সফটওয়্যারের চলার জন্য সার্বিক পরিবেশ তৈরি করে এই সিস্টেম সফটওয়্যার। এই সিস্টেম সফটওয়্যারের রয়েছে বেশ কিছু প্রকারভেদ। সেগুলো হলোঃ

অপারেটিং সিস্টেম (Operating System) 

অপারেটিং সিস্টেম হলো এমন একটি প্রোগ্রাম যা প্রাথমিক ভাবে লোড হওয়ার পর পরই কম্পিউটারের সকল হার্ডওয়্যার এবং অ্যাপ্লিকেশন সফটওয়্যার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিয়ে নেয় এবং সার্বিক ভাবে কম্পিউটারটিকে চালু করে। 

অপারেটিং সিস্টেমকে বলা যায় সিস্টেম সফটওয়্যারের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এটি এতটাই নিখুঁত উদাহরণ যে, সিংহভাগ মানুষ অপারেটিং সিস্টেম এবং সিস্টেম সফটওয়্যারকে সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করেন। অপারেটিং সিস্টেম নির্ধারণ করে একজন ব্যবহারকারী তার কম্পিউটারের সাথে ঠিক কোন পদ্ধতিতে যোগাযোগ করবে। কম্পিউটার নামক যন্ত্র ব্যবহারের প্রক্রিয়াটিই বদলতে যেতে পারে অপারেটিং সিস্টেমের উপর নির্ভর করে। বর্তমানে পৃথিবীর কিছু জনপ্রিয় অপারেটিং সিস্টেম এর নাম হলোঃ 

  • উইন্ডোজ (Windows)
  • ম্যাক ওএস (Mac OS)
  • লিনাক্স (Linux)

উল্লেখ্য যে, মোবাইলের ক্ষেত্রেও রয়েছ একাধিক অপারেটিং সফটওয়্যার। যেমনঃ অ্যান্ড্রয়েড (Android), আইওএস (iOS) 

ডিভাইস ড্রাইভার (Device Driver)

ডিভাইস ড্রাইভার হলো এমন এক ধরনের সিস্টেম সফটওয়্যার যা সাধারণত একটি নির্দিষ্ট হার্ডওয়্যারের পরিচালনাতেই ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এটি ড্রাইভার সফটওয়্যার নামেও বহুল পরিচিত। আমরা যখন কম্পিউটারে কোনো নতুন মাউস (Mouse) বা কিবোর্ড (Keyboard) ইন্সটল করি তখন লেখা ওঠে ‘Drive is installing.’ মূলত সেখানে এই ড্রাইভারের কথাই বলা হয়। এই সফটওয়্যার গুলো সাধারণত যেই সংশ্লিষ্ট যন্ত্রের সাথেই বিল্ট-ইন (Built-in) অবস্থায় থাকে। আবার অনেক সময় আলাদা করে ডাউনলোডও করে নিতে হয়। কিছু ডিভাইস ড্রাইভারঃ 

  • মাউস ড্রাইভার
  • কিবোর্ড ড্রাইভার
  • ডিসপ্লে / মনিটর ড্রাইভার 
  • বায়োস (Bios) ড্রাইভার 
  • মাদারবোর্ড ড্রাইভার 
  • প্রিন্টার ড্রাইভার

ফার্মওয়্যার (Firmware) 

ফার্মওয়্যার হলো এমন এক ধরনের সফটওয়্যার যা কম্পিউটারের রম (ROM) এ অবস্থান করে এবং কম্পিউটারের হার্ডওয়্যার গুলো কিভাবে চলবে সে সম্পর্কে প্রাথমিক নির্দেশনা প্রদান করে।

কারণ কম্পিউটার চালু হওয়ার সময় কিছু হার্ডওয়্যারের সঠিক ভাবে চালিত হওয়া জরুরী। যেমন সিপিইউ কুলার বা ফ্যান যদি না চলে তাহলে প্রসেসর অতিরিক্ত গরম হয়ে কম্পিউটার বন্ধ হয়ে যাবে। পাশাপাশি প্রসেসর এরও ক্ষতি হতে পারে। এরকম প্রয়োজনীয় হার্ডওয়্যার গুলোকে নির্দেশনা দেওয়া এবং কোনটায় সমস্যা দেখা দিলে তা ব্যবহারকারীকে জানানোই ফার্মওয়্যারের প্রধান কাজ। একে আধা-স্থায়ী সফটওয়্যারও বলা চলে। কারণ কম্পিউটারের স্থায়ী মেমোরি হলো রম। আর এই রমে অবস্থিত বিধায় ফার্মওয়্যার কখনোই মুছে যায় না। যদিও ফার্মওয়্যার আপডেটের কারনে এর পরিবর্তন আনা সম্ভব। ফার্মওয়্যারের কিছু উদাহরণঃ

  • বায়োস (BIOS – Basic Input / Output System) 
  • ইউইএফই (UEFI – Unified Extensible Firmware Interface)
  • এম্বেডেড সিস্টেম (Embedded System)

ইউটিলিটি সফটওয়্যার (Utility Software) 

ইউটিলিটি সফটওয়্যার হলো সে সকল সফটওয়্যার যেগুলো অপারেটিং সিস্টেমকে কম্পিউটারের সামগ্রিক পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা করার কাজে সাহায্য করে সম্পূর্ণ কম্পিউটার সিস্টেমকে আরও সাবলীল করে তোলে। 

অন্য সফটওয়্যার ইন্সটল বা আন-ইন্সটল করা, ভাইরাস মোকাবেলা করা, অপ্রয়োজনীয় ফাইল কম্পিউটার থেকে দূর করা এমন নানা কার্য সমাধান করাই ইউটিলিটি সফটওয়্যারের বৈশিষ্ট্য। এ ধরনের সফটওয়্যার গুলো নির্দেশ অনুযায়ী অথবা নির্দেশ ছাড়া স্বতন্ত্র ভাবেই কাজ করে কম্পিউটার সিস্টেমের সার্বিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। বিভিন্ন ধরনের ইউলিটি সফটওয়্যার হতে পারেঃ

    • এন্টিভাইরাস (Anti-virus): ভাইরাস বা ক্ষতিকর যেকোনো সফটওয়্যার থেকে কম্পিউটারকে সুরক্ষিত রাখাই এন্টিভাইরাস এর কাজ। এ লক্ষ্যে এন্টিভাইরাস সফটওয়্যার গুলো নিয়মিত কম্পিউটারকে স্ক্যান করে থাকে এবং কোনো ক্ষতিকর প্রোগ্রামের অস্তিত্ব দেখলে তা নির্মুল করে। 
    • ফাইল এক্সপ্লোরার (File Explorer): ফাইল এক্সপ্লোরার বা ফাইল ম্যানেজমেন্ট টুল হলো এমন একটি সফটওয়্যার যা কম্পিউটারের সকল ফাইলের ব্যবস্থাপনা করে থাকে। আমরা ‘My Computer’ বা ‘This PC’ তে ঢোকার পরে কয়েকটি ড্রাইভের ভেতর বিভিন্ন ফোল্ডারে আমাদের প্রয়োজনীয় ফাইল গুলো রাখি। এই পুরো প্রক্রিয়াটিই হয়ে থাকে ফাইল এক্সপ্লোরার এর মাধ্যমে।
    • ডিস্ক ম্যানেজমেন্ট টুল (Disk Management Tool): কম্পিউটারের হার্ড ড্রাইভ বা এসএসডি গুলো কয়েকটি ড্রাইভ বা অংশে ভাগ করা থাকে। যেমনঃ সি (C) ড্রাইভ, ডি (D) ড্রাইভ, ই (E) ড্রাইভ। আর যেকোনো স্টোরেজ ডিভাইস কে এভাবে ভাগ করার জন্য যেই সফটওয়্যার ব্যবহৃত হয় তাই ডিস্ক ম্যানেজমেন্ট টুল। 
    • ডিফ্র্যাগমেন্টার টুল (Defragmenter Tool): কম্পিউটার কিছুদিন ব্যবহারের পড়ে একটি ড্রাইভে থাকা ডাটা গুলো অনেকটাই ফ্র্যাগমেন্টেড (Fragmented) হয়ে পড়ে। ডাটা ফ্র্যাগমেন্টেশন অর্থ হলো একই ডাটা বা তা কিছু অংশ অদৃশ্য ভাবে বিভিন্ন স্থানে জমা থাকে। এটি বিশেষত হয় সি ড্রাইভে। আর এর ফলে কম্পিউটারের গতি এবং স্টোরেজ দুইটিই কমে যায়। কিছু সফটওয়্যার এই ধরনের ফ্র্যাগমেন্টেড ড্রাইভকে ডিফ্র্যাগমেন্ট করে অর্থাৎ ডাটা গুলোকে সাজিয়ে ফেলে। যেমনঃ স্মার্ট ডিফ্র্যাগ (Smart Defrag), ডিফ্র্যাগার (Defragger) 
    • ডিস্ক ক্লিনআপ টুল (Disk Cleanup Tool): অনেক সময়ই আমাদের কম্পিউটারে বা মোবাইলে অনেক অপ্রয়োজনীয় ফাইল জমা হয়ে থাকে। এগুলোকে সাধারণত বলে ‘ক্যাশ ফাইল’ (Cache File)। এ ধরনের ক্যাশ ফাইল দূর করার জন্য অনেক ধরনের ইউলিটি সফটওয়্যার রয়েছে। যেমনঃ সি ক্লিনার, 
    • কম্প্রেশন টুল (Compression Tool): কোনো ফাইল নিখুঁত ভাবে সংরক্ষণ বা স্থানান্তর করার জন্য কম্প্রেশন এবং ডি-কম্প্রেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রক্রিয়া। কম্প্রেশনের মাধ্যমে একটি ফাইলের ধরন বদলে যায় এবং তা সরাসরি খোলা যায় না। ফলে তা সুরক্ষিত থাকে। আর ডিকম্প্রেশনের সাহায্যে তা আবার সরাসরি ব্যবহারযোগ্য হয়। আর এ ধরনের কম্প্রেশন-ডিকম্প্রেশন টুল হলোঃ উইনজিপ (WinZip), উইনরার(WinRAR), সেভেন জিপ (7Zip)। 

প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ ট্রান্সলেটর (Programming Language Translator)

কম্পিউটার সরাসরি মানুষের ভাষা বোঝে না বিধায় মানুষকেই এমন ভাষায় প্রোগ্রামিং করতে হয় যা কম্পিউটারের জন্য অনুবাদযোগ্য। কিন্তু মানুষ যেই ভাষায় কোড লেখে তাকে উচ্চ পর্যায়ের ভাষা হিসেবে ধরা হয়। যেমনঃ জাভা (Java), সি (C ), সি++ (C++), পাইথন (Python)। এই ভাষাকে ‘মেশিন-লেভেল কোড’ অর্থাৎ যন্ত্র বুঝতে পারে এমন ভাষায় রুপান্তরের জন্য কাজ করে বিভিন্ন ট্রান্সলেটরঃ

  • ইন্টারপ্রেটার (Interpreter) 
  • কম্পাইলার (Compiler) 
  • অ্যাসেম্বলার (Assembler)

অ্যাপ্লিকেশন সফটওয়্যার (Application Software) 

অ্যাপ্লিকেশন সফটওয়্যার সে সকল সফটওয়্যার যেগুলো সিস্টেম সফটওয়্যারের উপর নির্ভর করে নির্দিষ্ট কিছু কাজের জন্য বিশেষায়িত এবং সাধারণত কম্পিউটারের ফ্রন্ট-এন্ড এ অবস্থান করে। এদেরকে বলা যায় এন্ড-ইউজার (End-User) বা ফ্রন্ট-এন্ড (Front-End) সফটওয়্যার। অর্থাৎ কম্পিউটারের ব্যবহারকারী সরাসরি মূলত এসব সফটওয়্যারই ব্যবহার করে থাকে। অ্যাপ্লিকেশন সফটওয়্যার হতে পারে অসংখ্য রকমের। নিচের শুধু কিছু জনপ্রিয় ধরন সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হয়েছে।

ওয়ার্ড প্রসেসর (Word Processor)

এ ধরনের সফটওয়্যারের সাথে মোটামুটি সবাই পরিচিত। মূলত এ সকল সফটওয়্যারের সৃষ্টি হয়েছে বিভিন্ন ডকুমেন্ট তৈরি, সম্পাদন এবং প্রিন্ট করার জন্য। এ সকল সফটওয়্যারের ব্যবহার কম্পিউটারের একদম বেসিক ব্যবহারের মধ্যে পড়ে। এরকম কিছু সফটওয়্যারঃ

  • মাইক্রোসফট ওয়ার্ড (Microsoft Word)
  • গুগল ডকস (Google Docs) 
  • অ্যাপল আইওয়ার্ক – পেজেস (Apple iWork – Pages) 

গ্রাফিক্স সফটওয়্যার (Graphics Software)

যে সকল সফটওয়্যার মূলত গ্রাফিক্স নিয়ে কাজ করে অর্থাৎ বিভিন্ন ছবি, ভিডিও থেকে শুরু করে থ্রিডি শেপের বস্তু তৈরি এবং সম্পাদনা করতে পারে তাদেরকেই বলে গ্রাফিক্স সফটওয়্যার। এর সাহায্যে শুধু ছবি, ভিডিও এডিট করা যায় তা নয়। বরং কৃত্রিম ছবি বা ডিজাইনও সৃষ্টি করা যায়। যেমনঃ 

  • এডবি ফটোশপ (Adobe Photoshop)
  • এডবি ইলুস্ট্রেটর (Adobe Illustrator) 
  • ব্লেন্ডার (Blender) 
  • অটোডেস্ক মায়া (AutoDesk Maya) 
  • ইঙ্কস্কেপ (InkScape)

মাল্টিমিডিয়া সফটওয়্যার (Multimedia Software) 

যে সকল সফটওয়্যার ছবি, ভিডিও ইত্যাদি মিডিয়া ফাইল চালু করা, সম্পাদনা করা অথবা নতুন মিডিয়া ফাইল তৈরি করার কাজে ব্যবহৃত হয়ে থাকে সেগুলোকে মাল্টিমিডিয়া সফটওয়্যার বলে। যেমনঃ 

  • ভিএলসি মিডিয়া প্লেয়ার (VLC Media Player) 
  • পিকসআর্ট (PicsArt) 
  • পিকাসা (Picasa) 
  • এডবি ফটোশপ (Adobe Photoshop) 

এডবি ফটোশপ গ্রাফিক্স সফটওয়্যার হলেও এটি মাল্টিমিডিয়া সফটওয়্যার হিসেবেও কাজ করে। এভাবে এক সফটওয়্যার একাধিক কাজে ব্যবহৃত হতেই পারে। 

ওয়েব ব্রাউজার (Web Browser) 

ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবে ব্রাউজ করা তথা সার্বিক ভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার করার জন্য যে সকল সফটওয়্যার ব্যবহৃত হয় তাদেরকে বলে ওয়েব ব্রাউজার। বর্তমানে সকল কম্পিউটার এবং মোবাইলেই অন্তত একটি ব্রাউজার সিস্টেম সফটওয়্যারের সাথে আগে থেকেই ইন্সটল করা থাকে। এই ব্রাউজার গুলো ব্যবহৃত হয় ইন্টারনেটের অসংখ্য পেজ থেকে নির্দিষ্ট পেজ খুঁজে বের করতে হবে সে সকল পেজের কন্টেন্ট উপভোগ করতে। এদের কম্পিউটার সবচেয়ে প্রাথমিক অ্যাপ্লিকেশন সফটওয়্যার বলা চলে। যেমনঃ

  • গুগল ক্রোম (Google Chrome) 
  • মাইক্রোসফট এজ (Microsoft Edge) 
  • অপেরা (Opera) 
  • ব্রেভ (Brave)
  • ফায়ারফক্স (Firefox) 

মিডলওয়্যার

মিডলওয়্যার হলো এমন এক ধরনের কম্পিউটার সফটওয়্যার যা কম্পিউটারের অ্যাপ্লিকেশন সফটওয়্যার এবং সিস্টেম সফটওয়্যারের মধ্যে অথবা দুইটি অ্যাপ্লিকেশন সফটওয়্যারের মধ্যেই অবস্থান করে। 

মিডলওয়্যার মূলত একটি সংযোগ মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। যেমন মিডলওয়্যারের সাহায্যে একটি সাধারণ অ্যাপ্লিকেশন মাইক্রোসফট উইন্ডোজের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে। আবার একটি নতুন অ্যাপ্লিকেশনকে অনেক পুরোনো সিস্টেমে চালানোর ক্ষেত্রেও মিডলওয়্যার ভূমিকা রাখে। আবার অনেক সময় এক কম্পিউটার থেকে আরেক কম্পিউটারে ওয়ার্ক রিকোয়েস্ট (Work Request) পাঠানোর ক্ষেত্রেও মিডলওয়্যার সহযোগিতা করে। যেমনঃ 

  • অ্যাপ্লিকেশন ফ্রেমওয়ার্ক (Application Framework)
  • গেম ইঞ্জিন (Game Engine) 
  • ডাটা আক্সেস (Data Access) 

সিস্টেম ও অ্যাপ্লিকেশন সফটওয়্যারের পার্থক্য 

সিস্টেম ও অ্যাপ্লিকেশন সফটওয়্যারের মধ্যে বৈশিষ্ট্যগত দিক থেকে নানা পার্থক্য রয়েছে। আর এ সকল পার্থক্য জানার মাধ্যমেই এদের নির্দিষ্ট বৈশিষ্টাবলি সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারনা পাওয়া সম্ভব। 

সিস্টেম সফটওয়্যার  অ্যাপ্লিকেশন সফটওয়্যার 
১। এসব সফটওয়্যার মানুষের সাথে কম সম্পৃক্ত। বরং হার্ডওয়্যারের সাথে বেশি সম্পৃক্ত।  ১। এসব সফটওয়্যার হার্ডওয়্যারের সাথে কম সম্পৃক্ত। এদের বেশি যোগাযোগ মানুষের সাথে। 
২। সিস্টেম সফটওয়্যার তুলনামূলক লো-লেভেল ল্যাঙ্গুয়েজে লেখা হয় বিধায় এদের প্রসেসিং এর গতি অনেক দ্রুত।  ২। অ্যাপ্লিকেশন সফটওয়্যার তুলনামূলক হাই-লেভেল ল্যাঙ্গুয়েজে লেখা হয় বিধায় এদের প্রসেসিং এর গতি তুলনামূলক ধীর।
৩। এরা অন্য সফটওয়্যারের কাজ করার পরিবেশ বা ভিত্তি তৈরি করে থাকে। ফলে এরা অ্যাপ্লিকেশন সফটওয়্যারের উপর নির্ভরশীল নয়।  ৩। এরা কাজ করার জন্য সিস্টেম সফটওয়্যারের উপর নির্ভশীল।  
৪। এরা তুলনামূলক কম স্থান দখল করে।  ৪। এরা তুলনামূলক বেশি স্থান দখল করে। 
৫। সিস্টেম সফটওয়্যার তৈরি করা এবং তা পরিবর্তন করা দুটোই বেশ কঠিন।  ৫। অ্যাপ্লিকেশন সফটওয়্যার তৈরি এবং পরিবর্তন করা তুলনামূলক সহজ। 

ক্লোজড-সোর্স সফটওয়্যার (Closed-Source Software) 

যে সকল সফটওয়্যারের নির্মাতা বা স্বত্তাধিকারী সফটওয়্যারের সোর্স কোড সংরক্ষিত রাখেন এবং সেই সফটওয়্যার ব্যবহার, সম্পাদনা এবং প্রতিলিপি তৈরি করার সকল সত্বও সংরক্ষিত রাখেন সে সকল সফটওয়্যারকে বলা হয় ক্লোজড-সোর্স সফটওয়্যার।

সোর্স-কোড বলতে বোঝায় একটি সফটওয়্যারের ভিত্তি। একটি সফটওয়্যার মূলত প্রোগ্রামারের লেখা অসংখ্য কোডের সমন্বয় বই কিছু নয়। আর সেই কোডের সমন্বয়কেই বলে সোর্স কোড। আর ক্লোজড-সোর্স সফটওয়্যারের ক্ষেত্রে সেই সকল কোড সত্ত্বাধিকারী নিজের কাছেই রাখেন। ফলে সফটওয়্যারটি যেকেউ ব্যবহার করতে পারলেও মূল ক্ষমতা সত্ত্বাধিকারীর হাতেই থেকে যায়। 

কমার্শিয়াল সফটওয়্যার (Commercial Software) 

যে সকল ক্লোজড-সোর্স সফটওয়্যার সাধারণ মানুষ অথবা কোনো কোম্পানি ব্যবহার করতে হলে সেগুলো ক্রয় করতে হয় সেগুলোকে কমার্শিয়াল বা বাণিজ্যিক সফটওয়্যার বলে। এটি ক্লোজড-সোর্স সফটওয়্যারের সবচেয়ে প্রকৃষ্ট এবং সুপরিচিত রুপ। অধিকাংশ ক্লোজড-সোর্স সফটওয়্যারই বাণিজ্যিক ভাবে কেনা বেচা হয়। সফটওয়্যার তৈরির পিছনে বাজেট, বাজারের অবস্থা, এর কার্যকারিতা, লাইসেন্স এর সময়কাল এমন নানা কিছুর উপর ভিত্তি করে এসবের দাম নির্ধারিত হয়।

  • ভিএক্স ওয়ার্কস (VX Works): ১০,০০০ ডলার থেকে ১ লক্ষ ডলার। 
  • এইচপিই ইন্টিলিজেন্ট ম্যানেজমেন্ট সেন্টার (HPE Intelligent Management Center): ৩০,০০০ ডলার। 
  • মাইক্রোসফট এসকিউএল সার্ভার এন্টারপ্রাইস এডিশন (Microsoft SQL Server Enterprise Edition): ১৩,৭৪৮ ডলার। 
  • উইন্ডোজ ১০ হোম (Windows 10 Home): ১৩৯ ডলার। 
  • জিটিএ ৫ (GTA V) – ২০ ডলার।

শেয়ারওয়্যার (Shareware) 

শেয়ারওয়্যার হলো এমন এক ধরনের ক্লোজড-সোর্স সফটওয়্যার যেগুলো একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত অথবা কিছু নির্দিষ্ট শর্ত মেনে ফ্রি তে ব্যবহার করা যায়। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মেয়াদ শেষ হওয়ার পর পরই সফটওয়্যারটি কাজ করা পুরোপুরি অথবা আংশিক বন্ধ করে দেয়।

অ্যাডওয়্যার (Adware)

এ ধরনের সফটওয়্যার গুলো মূলত বিজ্ঞাপন নির্ভর। ব্যবহারকারীরা এগুলো ফ্রিতে ব্যবহার করতে পারলেও এসব সফটওয়্যার ক্রমাগত প্রচুর বিজ্ঞাপন দেখাতে পারে। এভাবেই সফটওয়্যার নির্মাতারা টাকা আয় করে। বিজ্ঞাপনের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে চাইলে গ্রাহককে অবশ্যই টাকা খরচ করে সফটওয়্যারটি কিনতে হবে। উদাহরণঃ গুগল প্লে স্টোরের বেশিরভাগ ফ্রি গেমই অ্যাডওয়্যারের আওতায় পড়ে। 

ডেমোওয়্যার (Demoware)

যে সকল সফটওয়্যার একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ফ্রি তে ব্যবহার করা যায় তাদেরকে বলে ডেমোওয়্যার। এই ডেমোওয়্যারের আবার দুইটি ভাগ আছে। (i) ক্রিপলওয়্যার এবং (ii)ট্রায়ালওয়্যার। ক্রিপলওয়্যারের ক্ষেত্রে সফটওয়্যারটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ব্যবহারকারীকে খুবই স্বল্প সুযোগ সুবিধা দিয়ে থাকে। অনেক সময় ওয়াটারমার্কও বসানো হয়। কিন্তু ট্রায়ালওয়্যারের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত এমন কোনো সমস্যা থাকে না। বরং ব্যবহারকারী সফটওয়্যারের পূর্ণ সুবিধাই নিতে পারে। সময় শেষ হলে টাকা দিয়ে কিনে সফটওয়্যার ব্যবহার করতে হয়। যেমনঃ 

  • ক্যাসপারাস্কি (Kaspersky)
  • বিটডিফেন্ডার (Bit Defender)

ফ্রিওয়্যার (Freeware)

যে সকল সফটওয়্যার ক্লোজড-সোর্স হওয়া সত্বেও সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ব্যবহার করতে দেওয়া হয় সেগুলোকেই বলে ফ্রিওয়্যার। এ ধরনের সফটওয়্যারের সোর্স কোড উন্মুক্ত করা হয় না। একই সাথে এগুলো কপিরাইট এরও আওতাভুক্ত থাকে। সেই কপিরাইট এর উপরই নির্ভর করে আপনি সেই সফটওয়্যারটিকে কোনো ধরনের মডিফাই করতে পারবেন নাকি পারবেন না। যেমনঃ

  • অডাসিটি (Audacity)
  • স্কাইপি (Skype)
  • টিম ভিউয়ার (Tema Viewer) 
  • সেভেন জিপ (7Zip)
  • গুগল ক্রোম (Google Chrome)

ওপেন-সোর্স সফটওয়্যার (Open-Source Software) 

ওপেন-সোর্স সফটওয়্যার হলো সেই সকল সফটওয়্যার যেগুলোর সোর্স-কোড (Source-Code) সকলের জন্য উন্মুক্ত। নির্মাতারাই অনেক সময় সফটওয়্যারের সোর্স-কোড উন্মুক্ত করে দেয়। তখন সেটি ওপেন-সোর্স সফটওয়্যার হয়ে যায়। আবার পাবলিক-ডোমেইন (Public-Domain) সফটওয়্যারের ক্ষেত্রেও অনেক সময় সোর্স-কোড প্রকাশ করা হয়। ওপেন-সোর্স সফটওয়্যারের সবচেয়ে দারুণ দিক হলো পৃথিবীর যেকেউ এই সোর্স-কোড ব্যবহার করে যেকোনো কিছু করতে পারে। অর্থাৎ এই সোর্স-কোড ব্যবহার করে কোনো একজন প্রোগ্রামার সফটওয়্যারটিকে আপগ্রেড করতে পারে। আবার পরিবর্তন এনে একদম ভিন্ন কিছুতেও রুপান্তরিত করে ফেলতে পারে। কমার্শিয়াল সফটওয়্যারের ক্ষেত্রে এমন কিছু করতে হলে নির্মাতাদের কাছ থেকে আইনি অনুমতি লাগে। কিন্তু ওপেন-সোর্স সফটওয়্যারের ক্ষেত্রে যেকেউ এসব পরিবর্তন আইনত আনতে পারে। কিছু জনপ্রিয় ওপেন-সোর্স সফটওয়্যারঃ 

  • লিনাক্স (Linux) 
  • মজিলা ফায়ার ফক্স (Mozila Fire Fox) 
  • ভিএলসি মিডিয়া প্লেয়ার  (VLC Media Player) 

শেষকথা

একটি কম্পিউটার ক্রয়ের ক্ষেত্রে হার্ডওয়্যার সম্পর্কে জ্ঞান বেশি প্রয়োজন হলেও কম্পিউটারটি চালাতে সবচেয়ে বেশি হয় সফটওয়্যার সম্পর্কিত জ্ঞান। আর বর্তমান সময়ে প্রায় সকল প্রতিষ্ঠানেই কম্পিউটার সম্পর্কিত জ্ঞান থাকাটা আবশ্যিক হিসেবে ধরা হয়। আর এক্ষেত্রে মূলত সফটওয়্যার সম্পর্কিত জ্ঞানকেই বোঝানো হয়। তাই প্রত্যেকেরই সফটওয়্যার জিনিসটি আসলে কি, কোন সফটওয়্যার কোন ধরনের প্রকারভেদের ভেতরে পড়ে সে সম্পর্কে পরিষ্কার ধারনা রাখা। 

অনবরত জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী 

১। সফটওয়্যার ক্রয় করলে কি সারা জীবন ব্যবহার করা যায়? 

উত্তরঃ এটি নির্ভর করে সফটওয়্যারের লাইসেন্সের উপর। কিছু সফটওয়্যার একবার ক্রয় করলে সারা জীবন ব্যবহার করা যায়। যেমন উইন্ডোজ। আবার কিছু দামি সফটওয়্যার মাসিক, অর্ধ-বার্ষিক কিংবা বার্ষিক ভিত্তিতেও লাইন্সেস বিক্রয় করে থাকে।

২। বাণিজ্যিক সফটওয়্যার না ক্রয় করে কোনো ভাবে ব্যবহার করাটা কি বেআইনী?

উত্তরঃ অবশ্যই বেআইনী। বাংলাদেশে এ সংক্রান্ত আইনের প্রয়োগ তেমন না থাকলেও বিশ্বে অনেক দেশেই এটি বেশ গুরুতর অপরাধ হিসেবে ধরা হয়।

৩। পাবলিক ডোমেইন সফটওয়্যার কাকে বলে? 

উত্তরঃ অনেক সময় সরকারী নানা প্রজেক্টে নতুন নতুন সফটওয়্যার তৈরি করা হয় যা প্রজেক্ট শেষে আর তেমন কোনো কাজে লাগে না। কিন্তু যেহেতু এগুলো সরকারি প্রজেক্টের জন্য তৈরি করা অর্থাৎ এটি জনগণের অর্থে তৈরি হয়েছে। তাই এর মালিক জনগণ এবং সে কারণেই অনেক সময় এর সোর্স-কোড প্রকাশ করে একে ওপেন-সোর্স সফটওয়্যার করে দেওয়া হয়।

রিলেটেড আর্টিকেল গুলো

Back to top button