কম্পিউটারটেকনোলজিল্যাপটপহার্ডওয়্যার

এসএসডি কি? এসএসডি এর কাজ ও সুবিধা

বর্তমানে বাংলাদেশের কম্পিউটার ব্যবহারকারীদের মনে কম্পিউটারের যেই অংশটি সবচেয়ে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে, সেটি হলো এসএসডি (SSD)। শুধু ব্যবহারকারী নয়, বরং বিক্রেতাদের মনেও এর স্থান সবচেয়ে উপরে। কম্পিউটার ঠিক করাতে দোকানে নিলেই প্রায় ৮০ ভাগ সময়ে বিক্রেতার মন্তব্য থাকে ‘একটা এসএসডি লাগালে ঠিক হয়ে যাবে’। কিন্তু আসলে এসএসডি (SSD) কি, এটি কিভাবে কাজ করে, কম্পিউটারের পারফর্মেন্স বাড়াতে এর ভূমিকা কতটুকু তা জানেন না অনেকেই। কোন কোন সমস্যা হলে তার সমাধান হিসেবে এসএসডি কাজে লাগতে পারে, এসএসডি লাগানোর আগে সেটুকু জানা চাই। তাই আজকের এই লেখায়, এসএসডি, এর কার্যপদ্ধতি, ধরন এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কোন এসএসডি কিনবেন তা বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। 

সূচিপত্রঃ

এসএসডি (SSD) কি?

এসএসডি (SSD) এর পূর্ণরুপ হলো সলিড স্টেট ড্রাইভ (Solid State Drive)। এসএসডি হলো এমন এক ধরনের নন-ভলাটাইল হার্ডওয়্যার যা ফ্লাশ মেমোরিতে অতি দ্রুত ডাটা সংরক্ষণ করে থাকে। নন-ভলাটাইল স্টোরেজের অর্থ এসএসডি (SSD) তে হার্ড ড্রাইভ (HDD) এর মতই অনির্দিষ্ট কালের জন্য ডাটা সংরক্ষণ করা যায়। ডাটা সংরক্ষণ করতে র‍্যামের মতো সার্বক্ষণিক বিদ্যুতের দরকার পড়ে না। এছাড়াও ফ্লাশ মেমোরিতে ডাটা সংরক্ষণ করার অর্থ হলো, এটি অনেকটা পেনড্রাইভের মতো সরাসরি একটি মেমোরি চিপে ডাটা সংরক্ষণ করে থাকে। আর কিভাবে এই ডাটা সংরক্ষণের কাজটি করে থাকে সেটিই আলোচনা করা হয়েছে পরবর্তী ধাপে। 

এসএসডি (SSD) কিভাবে কাজ করে?

এসএসডি (SSD) কিভাব কাজ করে তা বুঝতে হলে প্রথমেই জানতে হবে ন্যান্ড (NAND) মেমোরি সম্পর্কে। ন্যান্ড মেমোরি হলো মূলত একধরনের স্টোরেজ চিপ যা বিদ্যুৎ ছাড়াও ডাটা সংরক্ষণ করতে পারে। অনেকটা পেনড্রাইভের মতো। বর্তমানে বেশিরভাগ এসএসডি (SSD) এই ন্যান্ড স্টোরেজ ব্যবহার করে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেই বিষয়টি সেটি হলো, এসএসডি (SSD) তে ডাটা সংরক্ষণের প্রক্রিয়াটি পুরোপুরিই বৈদ্যুতিক। হার্ড ড্রাইভ (HDD) এর মতো এখানে ঘূর্ণনশীল কোনো ডিস্ক নেই। কোনো যান্ত্রিক বিষয় নেই। তবে প্রক্রিয়াটিকে আরও ভাল ভাবে বুঝতে হলে কিছু বিষয়ে পরিষ্কার ধারনা থাকতে হবে। 

ন্যান্ড ফ্লাশ মেমোরি সেল 

ন্যান্ড ফ্লাশ মেমোরি মূলত অসংখ্য সেলের সমন্বয়ে গঠিত। এখানে সেলকে তুলনা করা যেতে পারে একটি ঘরের সাথে। যেই ঘরের ভেতর তথ্য জমা থাকে। একটি সেলের ভেতর তথ্য জমা থাকে বৈদ্যুতিক সিগনালের সাহায্যে। এক্ষেত্রে দুই ধরনের সিগনাল হয়ে থাকে, ০ এবং ১। যেকোনো একটি সিগনাল জমা থাকলেই তা ১ বিট ডাটা হিসেবে ধরা হয়। আর একটি সেলের ভেতর কয়টি এমন সিগনাল জমা করে রাখা যাবে, অর্থাৎ একটি ঘরে কয়টি তথ্য রাখা যাবে তার উপর নির্ভর করেই নির্ধারিত হয় সেলের ধরন। 

এসএলসি – সিঙ্গেল লেভেল সেল (SLC-Single Level Cell)

মাত্রই আমরা একটি সেলকে একটি ঘরের সাথে তুলনা করেছি। ধরা যাক একটি ঘরে ১টি বিছানা আছে। সেখানে একজন মানুষ থাকতে পারবেন। ঠিক তেমনই সিঙ্গেল লেভেল সেলের ক্ষেত্রে একটি সেলে ১ বিট ডাটা সংরক্ষণ করা যায়। 

এমএলসি – মাল্টি লেভেল সেল (MLC-Multi Level Cell)

ধরা যাক এই ধরনের সেলে দুইটি বিছানা রয়েছে। অর্থাৎ এই ধরনের সেলে দুই জন মানুষ থাকতে পারবে। ঠিক তেমনি মাল্টি লেভেল সেলে মূলত ২ বিট ডাটা সংরক্ষিত থাকে। এক্ষেত্রে ১ বিট ডাটাতে ০ অথবা ১ যেকোনো সিগনাল জমা থাকতে পারে। এভাবে ২ বিট ডাটাতে সর্বোচ্চ ৪ ধরনের সিগনাল কম্বিনেশন থাকা সম্ভব। 

টিএলসি – ট্রিপল লেভেল সেল (TLC-Triple Level Cell) 

উপরের দুইটি উদাহরণের মতো একই ভাবে টিএলসি সেলে ৩ বিট ডাটা সংরক্ষিত থাকে। 

কিউএলসি – কোয়াড লেভেল সেল (QLC-Quad Level Cell) 

কোয়াড দ্বারা বোঝায় চার। তাই কিউএলসি এর ক্ষেত্রেও একটি সেলে ৪ বিট ডাটা সংরক্ষণ করা যায়। 

পেজ এবং ব্লক (Page & Block) 

এসএসডি (SSD) এর ক্ষেত্রে পেজ দিয়ে বোঝায় সর্বনিম্ন কতটুকু ডাটা সেটি সংরক্ষণ করতে পারবে। এসএসডি ভেদে এই নিম্ন সীমা হতে পারে ৪ থেকে ১৬ কিলোবাইট। অর্থাৎ এর কম ডাটা এসএসডি সংরক্ষণ করতে পারে না। অপর দিকে ডাটা মুছে ফেলার ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন পরিমাণটিকে বলে ব্লক। অনেকগুলো পেজ মিলে একটি ব্লক তৈরি হয়। এক্ষেত্রে এসএসডি (SSD) ভেদে একটি ব্লকের আকার ১২৮ থেকে ৫১২ কিলোবাইট হতে পারে। 

রাইট অপারেশন (Write Operation) 

এসএসডি (SSD) এর তথ্য সংরক্ষণ প্রক্রিয়াকেই বলে রাইট অপারেশন। প্রতিটি এসএসডিতেই ন্যান্ড মেমোরির সাথে একটি ন্যান্ড কন্ট্রোলার (NAND Controller) থাকে। যখন কোনো ডাটা সংরক্ষণ করার প্রয়োজন হয় তখন এই কন্ট্রোলার বৈদ্যুতিক পালস পাঠায়। এই পালসের কারণে মেমোরি সেল গুলোতে ইলেক্ট্রন জমা হয় এবং মেমোরি সেলে ইলেক্ট্রিকাল চার্জের পরিবর্তন ঘটায়। সহজ ভাষায়, ডাটা সংরক্ষণ হয়। 

রিড অপারেশন (Read Operation)

এর মাধ্যমে ন্যান্ড কন্ট্রোলারটি সেল গুলোর চার্জের লেভেল পরিমাপ করে। চার্জ ও ভোল্টেজের লেভেল পরিমাপ করার মাধ্যমে কন্ট্রোলার সংরক্ষিত ডাটা বুঝতে পারে। একেই বলে রিড অপারেশন। যখন আমরা কোন তথ্য দেখতে চাই তখন এভাবেই তথ্যটিকে এসএসডির এর সেল থেকে বের করে আনা হয়। 

ইরেজ অপারেশন (Erase Operation) 

আমরা পূর্বেই বলেছি যে ডাটা মুছে ফেলার ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন পরিমাণ হলো ১ ব্লক। অর্থাৎ ১২৮ থেকে ৫১২ কিলোবাইট ডাটা। এসএসডি (SSD) চাইলেই এক পেজ (৪ – ১৬ কিলোবাইট) ডাটা মুছতে পারে। ডাটা মুছলে চাইলে একবারে একটি ব্লকের ডাটা মুছে ফেলতে হয়। এটিকেই বলে ইরেজ অপারেশন। 

মূলত এই তিনটি অপারেশন তথা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এসএসডি (SSD) ডাটা সংরক্ষণ, ব্যবহার এবং মুছে ফেলতে পারে। আর এক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে সেলের ধরন। আর এই সেলের ধরনের উপর নির্ভর করে এসএসডি কতদিন টিকবে তাও নির্ণয় করা যায়। সে সম্পর্কে লেখার পরবর্তী একটি অংশে আলোচনা করা হয়েছে বিস্তারিত। 

এসএসডি (SSD) ব্যবহারের সুবিধা 

এই লেখাটি পড়ে ইতোমধ্যে এসএসডি এর কাজ এবং সুবিধা সম্পর্কে হয়তো অনেকটাই ধারনা পেয়েছেন। কিন্তু এরপরেও অল্প কথায় পয়েন্ট আকারে কিছু সুবিধা তুলে ধরছি। এতে করে এক ঝলকেই বুঝতে পারবেন আসলে একটি এসএসডি কেন কেনা উচিত 

  • এসএসডি এর গতি অনেক বেশি হওয়ায় যেকোনো সফটওয়্যার অনেক দ্রুত লোড হয়। বিশেষ করে উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেম একটি এম.২ এসএসডি তে ৫-১০ সেকেন্ড লোড হয়। কিন্তু হার্ড ড্রাইভ (HDD) এর ক্ষেত্রে তা ২৬-৩০ সেকেন্ড সময় নেয়। 
  • ভিডিও এডিটিং জনিত কাজে উচ্চ রিড, রাইট স্পিডের প্রয়োজন। এক্ষেত্রে এসএসডি প্রায় বাধ্যতামূলক। 
  • একটি পার্টস লাগিয়েই যদি কম্পিউটারের পারফর্মেন্স অনেকটুকু বাড়াতে চান, তাহলে সেই পার্টসটি এসএসডি। সম্পূর্ণ পারফর্মেন্স কিছুটা হলেও দ্রুততা পাবে। 
  • এর ভেতরে যান্ত্রিক কোনো কার্যকলাপ না থাকায় নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা একদমই কম। 
  • যান্ত্রিক জটিলতা হয় না বলে হার্ড ড্রাইভ (HDD) এর তুলনায় এটি টেকেও অনেকদিন। একটি সাধারণ এসএসডি ৫ বছর টেকে। খুব ভাল মানের এসএসডি ১০ বছর অবধিও সার্ভিস দিতে পারে। 
  • এসএসডি এর শক এবজর্বিং (Shock Absorbing) ক্ষমতা হার্ড ড্রাইভ (HDD) থেকে ভাল। 
  • এসএসডি তুলনামূলক কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করে বিধায় বিদ্যুৎ খরচ কম হয়। 
  • এসএসডি এর আকার ছোট হওয়ায় এটি খুব সহজে বহন ও সহজে কম্পিউটারে সেট করা যায়। 
  • এসএসডি তে হার্ড ড্রাইভের ন্যায় আলাদা করে বৈদ্যুতিক সংযোগ দিতে হয় না। 

এসএসডি (SSD) এর ধরন ও কেনার আগে বিবেচ্য বিষয়াবলী 

যেহেতু বর্তমানে প্রায় সকলেই হার্ড ড্রাইভের (HDD) বদলে এসএসডি (SSD) এর দিকে ঝুকছেন, তাই এসএসডি কেনার আগে অবশ্যই কিছু বিষয় মাথায় রাখা জরুরী। 

ফর্ম ফ্যাক্টর (Form Factor) 

একটি এসএসডি এর আকার, আকৃতি ও সংযুক্তির ধরনকে একত্রে যার মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়ে থাকে, তাকে বলে ফর্ম ফ্যাক্টর। এসএসডি কেনার আগে ফর্ম ফ্যাক্টর সম্পর্কে ধারনা রাখা সবচেয়ে বেশি জরুরী। কারণ ভুল ফর্ম ফ্যাক্টরের এসএসডি ক্রয় করলে হয়তো দেখা যাবে সেই এসএসডি আপনার কম্পিউটারে লাগানোই যাবে না। যেমন অনেক কম্পিউটারেই সর্বোচ্চ ২.৫ ইঞ্চি এসএসডি সংযুক্ত করার স্থান রয়েছে। কিন্তু কিছু একদম চিকন ল্যাপটপে এই ধরনের এসএসডি সংযুক্ত করার স্থানও নেই। আবার অনেক সময় দেখা যায় পুরোনো কম্পিউটারে এম.২ এসএসডি লাগানোর উপায়ই থাকে না। তাই এসএসডি ক্রয়ের আগে নিশ্চিত হোন যে সেটি আপনার কম্পিউটারের সাথে যায় কি না। বর্তমানে প্রধানত দুই ধরনের ফর্ম ফ্যাক্টরের এসএসডি বাজারে পাওয়া যায়। 

২.৫ ইঞ্চ এসএসডি (2.5 Inch SSD) 

২.৫ ইঞ্চ এসএসডি এর নামের মধ্যেই এর আকার বলা আছে। এই ধরনের এসএসডি গুলোর আকার প্রস্থ হয়ে থাকে ২.৫ ইঞ্চি। যা মূলত ল্যাপটপ সমূহের হার্ড ড্রাইভের সমান। তবে এদের আকার হার্ড ড্রাইভ থেকে অনেকটাই কম। এদের গড়ন একটি চারকোণা ছোট বক্সের মতো। উচ্চত মাত্র ৫-১৫ মিলিমিটার (সাধারণত ৭ মিলিমিটার)। উল্লেখ্য যে ২.৫ ইঞ্চির সকল এসএসডি গুলোই সাটা ৩.০ (SATA III) ইন্টারফেসের হয়ে থাকে। 

এম.২ এসএসডি (M.2 SSD) 

এম.২ এর পূর্বের নাম ছিল নেক্সট জেনারেশন ফর্ম ফ্যাক্টর (NGFF)। এই এনজিএফএফ (NGFF) এমসাটা (mSATA) ফর্ম ফ্যাক্টরকে সরিয়ে বাজারে আসে। পরবর্তীতে এর নামকরণ হয় এম.২। এম.২ দিয়ে মূলত বোঝায় এসএসডি এর ধরন ও প্রস্থ। তবে পূর্ণাঙ্গ নামের সাহায্যে এম.২ এসএসডি এর দৈর্ঘ্য প্রস্থ দুটিই বলা সম্ভব। এম.২ এর সকল এসএসডি এর প্রস্থই ২২ মিলিমিটার। কিন্তু দৈর্ঘ্য তিন ধরনের হতে পারে। এর দৈর্ঘ্য ও প্রস্থকে চারটি অংক দ্বারা প্রকাশ হয়। এরকম মোট ৩টি সংখ্যা রয়েছে। সেগুলো হলোঃ 2280, 2260, 2242। এখানে প্রতিটি সংখ্যাই ২২ দিয়ে শুরু। অর্থাৎ প্রতিটি এসএসডি এর প্রস্থ ২২ মিলিমিটার। কিন্তু এসএসডি ভেদে এর দৈর্ঘ্য হতে পারে যথাক্রমে ৮০, ৬০ এবং ৪২ মিলিমিটার। এম.২ ফর্ম ফ্যাক্টরের এসএসডি গুলো সাধারণত দুই ধরনের ইন্টারফেস ব্যবহার করে থাকে। 

ইন্টারফেস (Interface) 

ইন্টারফেসের ধরন নিয়ে কথা বলার আগে ইন্টারফেস বিষয়টা কি তা পরিষ্কার করাটা জরুরী। ইন্টারফেস হলো এসএসডি এর সাথে মাদারবোর্ডের সংযোগের মাধ্যম। ফর্ম ফ্যাক্টর দিয়ে যেমন এসএসডি এর আকার বোঝায়, ঠিক তেমনই ইন্টারফেস দিয়ে বোঝায় কিভাবে এসএসডি মাদারবোর্ডের সাথে যুক্ত হবে। আর এর উপরেই নির্ভর করে এসএসডি এর গতি। বর্তমানে এসএসডি তে দুই ধরনের ইন্টারফেস ব্যবহৃত হচ্ছে। 

সাটা ৩.০ (SATA III)

সাটা ৩.০ হলো কম্পিউটার জগতের সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত সংযোগ মাধ্যম গুলোর একটি। বর্তমানের সকল হার্ড ড্রাইভ (HDD) সাটা ৩.০ ইন্টারফেস ব্যবহার করে। এই ইন্টারফেসের ক্ষেত্রে ক্যাবলের সাহায্যে মাদারবোর্ডের সাথে এসএসডি অথবা হার্ড ড্রাইভ (HDD) কে যুক্ত করা হয়ে থাকে। তবে যে সকল এসএসডি সাটা ৩.০ ইন্টারফেস ব্যবহার করে সেগুলো সবচেয়ে ধীর গতির। তবে এরপরেও এদের গতি হার্ড ড্রাইভ (HDD) থেকে অনেক বেশি। সাধারণত এ ধরনের এসএসডি গুলোর গতি হয়ে থাকে ২০০-৫৫০ মেগাবাইট পার সেকেন্ড। ২.৫ ইঞ্চির সকল এসএসডি এবং এম.২ ফর্ম ফ্যাক্টরের কিছু এসএসডি সাটা ৩.০ ইন্টারফেস ব্যবহার করে। 

পিসিআইই (PCIe) 

পিসিআইই এর পূর্ণরুপ হলো পেরিফেরাল কম্পোনেন্ট ইন্টারকানেক্ট এক্সপ্রেস (Peripheral Component Interconnect Express)। এই ইন্টারফেসটি ব্যবহৃতই হয়ে থাকে মাদারবোর্ডের সাথে বিভিন্ন হাইস্পিড কম্পোনেন্ট যুক্ত করার জন্য। মূলত গ্রাফিক্স কার্ড সংযুক্ত করার জন্যই পিসিআইই ব্যবহৃত হতো। তবে বর্তমানে এসএসডি সংযুক্ত করার অন্যতম মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে পিসিআইই (PCIe)।

পিসিআইই ইন্টারফেসটি অনেকগুলো ভাগে বিভক্ত থাকে। এই ভাগগুলোকে বলে লেন। একটি লেন যেমন থাকবে পারে, ঠিক তেমনি একসাথে ৪টি, ৮টি এমনকি ১৬টি লেনও থাকতে পারে। এখানে উল্লেখযোগ্য যে, বর্তমানে সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত পিসিআইই ভার্সন হচ্ছে পিসিআইই ৩.০ (PCIe 3.0)। তবে এর একদম নতুন ভার্সন হচ্ছে পিসিআইই ৪.০ (PCIe 4.0)। ভার্সন ৩.০ এর ১টি লেনে প্রতি সেকেন্ডে ৯০০-১০০০ মেগাবাইট ডাটা পরিবাহিত হয়। অর্থাৎ প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১ জিবি। সেক্ষেত্রে ৪টি লেনের ক্ষেত্রে এই ধারণক্ষমতা বেড়ে দাঁড়ায় প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৮ জিবিতে। সুতরাং বুঝতেই পারছেন, পিসিআইই সমৃদ্ধ এসএসডি এর সাথে সাটা এসএসডি এর পার্থক্য কতটুকু। পিসিআইই ৩.০ এর ক্ষেত্রে এসএসডি এর গতি ৩৭০০ মেগাবাইট (রিড) এবং ৩৪০০ মেগাবাইট (রাইট)। অপর দিকে পিসিআইই ৪.০ এর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৭০০০ মেগাবাইট (রিড) এবং ৫১০০ মেগাবাইট (রাইট) গতির এসএসডি বাংলাদেশের বাজারেই রয়েছে। 

ফর্ম ফ্যাক্টরের মতো একই ভাবে ইন্টারফেস সম্পর্কে জানা জরুরী। যেমন অনেক পুরোনো মাদারবোর্ডে পিসিআইই স্লটই নেই। ফলে পিসিআইই দিয়ে এসএসডি ব্যবহারেরও সুযোগ নেই। ঠিক একই ভাবে অনেক আধুনিক ল্যাপটপে সাটা পোর্টই থাকে না। ফলে সাটা এসএসডি সংযুক্ত করাও পুরোপুরি অসম্ভব। তাই এসএসডি ক্রয়ের আগে অবশ্যই দেখে নিতে হবে যে, আপনার কম্পিউটারের মাদারবোর্ড এবং এসএসডি এর মধ্যে মিল রয়েছে কি না। 

ন্যান্ড চিপের ধরন

লেখার প্রথম অংশেই ন্যান্ড চিপের ধরন সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। সেগুলো হলো এসএলসি, এমএলসি, টিএলসি এবং কিউএলসি। এক্ষেত্রে একটি বিষয় বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। এসএসডি এর জীবনসীমা নির্ভর করে পি/ই সাইকেলের উপর (P/E Cycle)। এসএসডি এর একটি পূর্ণ সেলকে মুছে ফেলে সেখানে আবার নতুন তথ্য সংরক্ষণের প্রক্রিয়াকে বলে পি/ই সাইকেল (P/E Cycle)। একটি এসএসডি এর এই সাইকেল যত বেশি হবে, তার জীবনসীমা তত কমবে। এক্ষেত্রে এসএলসি চিপের সহ্যক্ষমতা অনেক বেশি। এসএলসি সেলের ক্ষেত্রে ১ লক্ষ পি/ই সাইকেল পূর্ণ হওয়ার পরে এসএসডি এর স্বাস্থ্য নষ্ট হওয়া শুরু করে। এমএলসি এর ক্ষেত্রে এই সীমা মাত্র ১০,০০০ পি/ই সাইকেল। আর টিএলসি এর ক্ষেত্রে এর সীমা মাত্র ৩,০০০ সাইকেল। কিউএলসি এর ক্ষেত্রে এই সীমা সবচেয়ে কম, মাত্র ১,০০০ সাইকেল। তাই এসএসডি ক্রয়ের ক্ষেত্রে অবশ্যই কোন ধরনের সেলের এসএসডি কিনছেন তা মাথায় রাখা উচিত। তবে অনেক সময়ই কোম্পানি গুলো সেলের ধরন প্রকাশ করে না। আর এসএলসি সেল সমৃদ্ধ এসএসডি এর দামও অনেক হয়। কিন্তু কাছাকাছি দামের ভেতর পেলে যেই সেলের সাইকেলের সীমা বেশি, সেই সেল সমৃদ্ধ সেলই নেওয়া উচিত। 

রিড স্পিড ও রাইট স্পিড (Read Speed & Write Speed) 

সকল এসএসডি  (SSD)এর সাথেই তার রিড স্পিড ও রাইট স্পিড দেওয়া থাকে। এগুলো যাচাই করে তুলনামূলক দ্রুত গতির রিড রাইট সম্পন্ন এসএসডি কেনা উচিত। 

এনভিএমই স্টোরেজ ডিভাইস (NVMe Storage Device) কি? 

এনভিএমই (NVMe) স্টোরেজ ডিভাইস দ্বারা মূলত পিসিআইই (PCIe) সমৃদ্ধ এম.২ (M.2) স্টোরেজকেই বোঝানো হয়। এনভিএমই (NVMe) অনেকে ফর্ম ফ্যাক্টর বা ইন্টারফেস মনে করে। তবে বস্তুত এটি একটি প্রটোকল। অর্থাৎ এটি হলো এসএসডি এর ডাটা পরিবহনের জন্য নির্দিষ্ট কিছু কমান্ড। এই প্রটোকলটি তৈরিই করা হয়েছে পিসিআইই (PCIe) লেন ব্যবহার করে অতি দ্রুত ডাটা পাঠানোর জন্য। তাই বর্তমানে পিসিআইই (PCIe) ব্যবহারকারী সকল এসএসডি এই প্রটোকল মেনে চলে। এই এনভিএমই প্রটোকল সমৃদ্ধ যেকোনো স্টোরেজ ডিভাইসকেই বলা হয় এনভিএমই স্টোরেজ ডিভাইস। 

বাংলাদেশে এসএসডি (SSD) এর দাম 

বাংলাদেশের সাথে বৈশ্বিক বাজারের অনেকটাই তফাত রয়েছে। বেশিরভাগ সময়েই দেখা যায় যে বৈশ্বিক বাজারে দাম কমলেও বাংলাদেশে বিভিন্ন ছুতো দেখিয়ে দাম বেশি রাখা হয়। তবে দীর্ঘদিন পরে বাংলাদেশের কম্পিউটার বাজারে এসএসডির দাম কমেছে। বর্তমান বাজার অনুসারে বিভিন্ন ধরনের এসএসডির দাম নিচে দেওয়া হলোঃ 

ধরন  আকার  দাম
২.৫ ইঞ্চ এসএসডি (2.5 Inch SSD)  ১২০-১২৮ জিবি  ১,৫০০-৩,০০০ টাকা 
২৪০-২৫৬ জিবি  ১৯০০- ৩৬০০ টাকা 
৪৮০-৫১২ জিবি  ৫৭০০-৬০০০ টাকা 
এম.২ সাটা এসএসডি (M.2 SATA SSD)  ১২০-১২৮ জিবি  ১৬০০-২৩০০ টাকা 
২৪০- ২৫৬ জিবি  ২০০০-৩৬৫০ টাকা 
৪৮০-৫১২ ৩৬০০-৫৫০০ টাকা 
এম.২ এনভিএমই (M.2 NVME)  ১২০-১২৮ জিবি  ১৫০০-২৫০০ টাকা 
২৪০-২৫৬ জিবি  ১৯০০-৪৮০০ টাকা 
৪৮০-৫১২ জিবি  ২৯০০-৯৪০০ টাকা 
১ টেরাবাইট  ৫৩০০-২০০০০ টাকা। 

এখানে উল্লেখ্য যে, আগে এসএসডি এর দাম অনেকটাই বেশি ছিল। বর্তমানে অনেক স্বনামধন্য ব্র্যান্ড দাম কমালেও অন্য অনেক মডেলের দাম কমে নি। যেমন ১ টেরাবাইট এসএসডি এর ২০,০০০ টাকা দামী এসএসডি মার্কেটে রয়েছে। কিন্তু ৯০০০-১০,০০০ টাকা দামেই বাজারের প্রায় সেরা ব্র্যান্ডের এসএসডি ক্রয় করা সম্ভব। এক্ষেত্রে মডেল ও ব্র্যান্ডের পছন্দের উপর দাম নির্ভর করবে। 

শেষকথা 

সর্বোপরি এসএসডি (SSD) জিনিসটি এখন গণহারেই বিক্রয় হচ্ছে। কিন্তু মাদারবোর্ডের সাথে সঠিক এসএসডি কিনতে না পারার কারণে অনেকে তা ব্যবহারই করতে পারেন না। আবার অনেক সময় বাজারে অনেক ভাল ভাল এসএসডি থাকা সত্ত্বেও বেশি দাম দিয়ে খারাপ এসএসডি কিনে ফেলেন এক্ষেত্রে। বিশেষ করে বিক্রেতাদের প্ররোচনায় বিভ্রান্ত হন অনেকেই। তবে এই লেখাটি পড়ার পর আশা করি আপনি নিজেই সিধান্ত নিতে পারবেন কোন এসএসডি টি ভাল এবং কোন এসএসডি খারাপ। 

অনবরত জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী 

১। কখন হার্ড ড্রাইভ (HDD) এবং কখন এসএসডি (SSD) কিনবো?

উত্তরঃ যদি আপনার কাছে গতির তুলনায় স্টোরেজ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয় সেক্ষেত্রে হার্ড ড্রাইভ কিনবেন। যেমন আপনার যদি মুভি জমিয়ে রাখার অভ্যাস থাকে তাহলে হার্ড ড্রাইভই যথেষ্ট। অপরদিকে আপনি যদি এমন কোনো কাজ করে যেটায় সার্বক্ষণিক রিড রাইটের প্রয়োজন হয়, সেক্ষেত্রে এসএসডি প্রয়োজন। 

২। গেমিং এর জন্য এসএসডি (SSD) কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ?

উত্তরঃ গেমিং এর জন্য এসএসডি গুরুত্বপূর্ণ নয়। গেম চালনার সময় খুব বেশি রিড রাইট করার প্রয়োজন হয় না। এসএসডি থাকলে গেম দ্রুত লোড হবে, কিন্তু গেম চলাকালীন পার্ফর্মেন্সে কোনো প্রভাব পড়বে না। 

৩। এসএসডি (SSD) এর দাম কি আরও কমবে?

উত্তরঃ যেসব ব্র্যান্ড এখনো দাম কমায় নি সেগুলোর কমার সম্ভাবনা আছে। তবে যেকোনো মূহুর্তেই দাম বাড়িয়ে ফেলা অস্বাভাবিক কিছু নয়। 

 

রিলেটেড আর্টিকেল গুলো

Back to top button