অনলাইন ব্যাংকিংজীবন ও জীবিকাব্যাংকিং

ঋণ কি? ঋণ কতো প্রকার ও কী কী?

মানুষের জীবনে চাওয়ার শেষ থাকে না। যেমন, অনেকেরই হয়তো বাড়ি-গাড়ির স্বপ্ন থাকলেও একবারে সেই স্বপ্ন পূরণের সামর্থ্য সবার থাকে না। এক্ষেত্রে, জীবনের এমনই নানান গুরুত্বপূর্ণ, অথচ ব্যয়বহুল স্বপ্ন পূরণে বিভিন্ন আর্থিক প্রাতিষ্ঠান বা ব্যাংক থেকে আর্থিক সাহায্য পাওয়া যায়। তবে এসব আর্থিক সহায়তা আমরা ঋণ বা লোন হিসেবে পেয়ে থাকি। এসব লোনের মধ্যে রয়েছে হোম লোন, কার লোন, স্টুডেন্ট লোন ইত্যাদি। মোটামোটি সবধরনের আর্থিক সহায়তার জন্যই বিভিন্ন ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে লোন বা ঋণ দেয়া হয়ে থাকে। এমনকি পূর্ববর্তী ঋণের টাকা ফেরত দেয়ার জন্যও থাকে লোনের ব্যবস্থা। তবে ঋণ নেওয়ার আগেই আপনার উচিৎ সঠিক ঋনের ধরন নির্বাচন করা, যা আপনার প্রয়োজনের সাথে খাপে খাপে মিলে যায়। আজকে আমরা আলোচনা করবো বেশকিছু ঋণের ধরন এবং সেগুলোর বৈশিষ্ট্য নিয়ে।

ঋণ কি?

ঋণ হল একটি অর্থনৈতিক সম্পর্ক যেখানে একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান (ঋণগ্রহীতা) অন্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান (ঋণদাতা) থেকে অর্থ বা সম্পদ ধার করে। ঋণের অর্থ বা সম্পদ সাধারণত সুদসহ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফেরত দেওয়া হয়। ঋণ একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক হাতিয়ার যা অর্থের প্রবাহকে সচল রাখতে সাহায্য করে। এটি ব্যবসায়িক বৃদ্ধিকে উৎসাহিত করতে, ব্যক্তিদের তাদের লক্ষ্য অর্জন করতে, এবং সরকারের জন্য প্রয়োজনীয় প্রকল্পগুলি বাস্তবায়নে সহায়তা করতে পারে।

ঋণ বিভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যেতে পারে, যেমন:

  • ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে, যেমন মেশিনারি কিনতে, পণ্য উৎপাদন করতে, বা বিপণন করতে
  • ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যে, যেমন একটি বাড়ি কেনার জন্য, একটি গাড়ি কেনার জন্য, বা শিক্ষার জন্য
  • সরকারী উদ্দেশ্যে, যেমন অবকাঠামো নির্মাণ করতে, বা সামাজিক কর্মসূচি চালু করতে

ঋণের প্রকারভেদ

ঋণের ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ। যেমন: ঋণের পরিমাণ, ঋণের সুদ এবং মেয়াদ। তাছাড়া আবেদনকারীর মাসিক এবং বার্ষিক আয়ের সীমার দিকে লক্ষ্য রেখে ঋণের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়। বাংলাদেশে প্রয়োজনভেদে ঋণকে ৪ ভাগে ভাগ করা হয়। যেমন: 

১) সিকিউরড ঋণ

২) নন সিকিউরড ঋণ

৩) এসএমই বা কৃষি ঋণ

৪) কর্পোরেট ঋণ

সিকিউরড ঋণ

যখন কোনো ঋণগ্রহীতা ঋণ গ্রহণের নিমিত্তে স্থাবর কোনো সম্পত্তিকে জামানত হিসেবে ঋণদাতাকে প্রদান করেন তখন তাকে সিকিউরড বা বন্ধকী ঋণ বলে। বন্ধক রাখার বিষয়টি আমাদের সবার কাছেই পরিচিত। এক্ষেত্রে আপনার জমা রাখা সম্পদের বিপরীতে আপনাকে ঋণ দেওয়া হয়। যদি আপনি ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হন, তাহলে সেই বন্দক রাখা সম্পদ ব্যাংক নিয়ে নেয়। এই সিকিউরড লোন তথা বন্দকী ঋণের ক্ষেত্রে বাড়ি, গাড়ি, জমি ইত্যাদি বন্ধক রাখা হয়। সিকিউরড ঋণের বৈশিষ্ট্য:

  • সিকিউরড ঋণের সর্বনিম্ন পরিমাণ ৫০,০০০ টাকা। উর্ধ্বসীমা নির্ভর করে আপনার প্রয়োজনীয় অর্থের পরিমাণ এবং সম্পদের বাজার দরের উপর। 
  • এই ঋণের মেয়াদ ১২ মাস থেকে ৬০ মাস অবধি হয়ে থাকে।

হোম লোন (Home Loan) 

বাড়ি করতে একসাথে অনেক টাকা লাগে তাই সাধ ও সাধ্যের মধ্যে বিস্তর একটা পার্থক্য থেকেই যায়। সামর্থ্য অনুযায়ী কম টাকার সংস্থান থাকলেও যাতে বাড়ির স্বপ্ন পূরণ করা যায়, তা মাথায় রেখেই হোম লোন ব্যবস্থা চালু হয়েছে। তবে হোম লোন একটি সিকিউরড লোন যেখানে জামানতের বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে।

আবেদনকারীর স্থাবর কোনো সম্পত্তি জামানত রাখতে হয়। অথবা বাড়ী তৈরি হলে সেই বাড়ী নিজেই জামানত হিসেবে গৃহীত হয়। আপনি যদি ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হন, তাহলে ব্যাংক আপনার বাড়ী অধিগ্রহণের অধিকার রাখে। 

বাংলাদেশে প্রায় সব ব্যাংকই অল্প সময়ের মধ্যেই ঋণ দিয়ে দেয় অর্থাৎ লোন প্রসেসিং টাইম অনেক কম। তাছাড়া লোন নেয়ার জন্য অনেক বেশি কাগজপত্রও প্রয়োজন হয়না। হোম লোনের জন্য সাধারণত যেসব কাগজপত্রের প্রয়োজন হয় তা হলোঃ

ব্যাংক থেকে হোম লোন পাওয়ার জন্য সর্বনিম্ন মাসিক ইনকাম থাকতে হয় ৩০,০০০ থেকে ৫০,০০০ টাকা। তবে পেশাভেদে তা ভিন্ন হতে পারে, যেমন:

) বেতনভোগী কর্মকর্তা: ৩০,০০০ টাকা এবং ২ বছরের অভিজ্ঞতা।

) প্রফেশনাল ব্যক্তি: ৪০,০০০ টাকা এবং ৩ বছরের অভিজ্ঞতা।

) ব্যবসায়ী বা জমির মালিক: ৫০,০০০ টাকা এবং ৩ বছরের অভিজ্ঞতা (ট্রেড লাইসেন্স অনুসারে)।

বাংলাদেশে ৪ ক্ষেত্রে হোম লোন দেয়া হয়:

  • এপার্টমেন্ট/বাড়ি ক্রয়
  • নতুন বাড়ি নির্মাণ
  • পুরোনো ফ্লাট/বাড়ি সংস্কার
  • অন্যান্য ব্যাংক থেকে হোম লোন অধিগ্রহণ

নিম্নে বিভিন্ন ঋনের ঋণ সীমা, চার্জ, মেয়াদ, সুদের হার ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করা হলো। 

ঋণ সীমা চার্জ সমূহ মেয়াদ সুদের হার সিকিউরিটি আবেনকারীর
বয়স
সর্বোচ্চ ২ কোটি টাকা সর্বনিম্ন ৫ লক্ষ টাকা

অথবা 

নির্মাণ কাজের মোট মূল্যের ৭০%

আবেদনের ফি: ৫০০ টাকা।

প্রসেসিং ফি: অনুমোদিত ঋণের ১%।

কোনো লুক্কায়িত খরচ নেই।

সর্বোচ্চ: ২৫ বছর। ১০.১০% মর্টগেজ এবং আইজিপিএ। সর্বনিম্ন ২৫ থেকে সর্বোচ্চ ৬৫ বছর।

অটো/কার লোন (Auto/Car Loan) 

গাড়ি কেনার জন্য ব্যাংক বা অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো লোন দিয়ে থাকে যা অটো লোন হিসেবেও পরিচিত। দুই চাকার, চার চাকার সবধরনের গাড়ির জন্যই লোন দেয়া হয়। তবে এটি একটি সিকিউরড লোন এবং গাড়িটি রেজিস্ট্রেশন করা হয় ব্যাংকের নামে। যার ফলে কোনো সমস্যা দেখা দিলে ব্যাংক গাড়িটিকে আটক করার অধিকার রাখে। তবে কার লোন নেয়ার জন্য যেকোনো পেশার ব্যক্তিদেরই সর্বনিম্ন একটি মাসিক ইনকাম থাকা লাগে যেমন:

) বেতনভোগী কর্মচারী: ৩০,০০০ টাকা এবং ২ বছরের অভিজ্ঞতা।

) প্রফেশনাল বা ব্যবসায়ী: ৪০,০০০ টাকা এবং ৩ বছরের অভিজ্ঞতা।

বাংলাদেশে ২ ক্ষেত্রে অটো লোন দেয়া হয়:

  • নতুন গাড়ী ক্রয়
  • রি-কন্ডিশন্ড গাড়ী ক্রয়

নিচে থাকছে অটো-লোনের সারমর্ম:

ঋণ সীমা চার্জ সমূহ মেয়াদ সুদের হার সিকিউরিটি আবেনকারীর
বয়স
গাড়ীর মূল্যের ৫০%(তবে ৪০ লক্ষ টাকার বেশি নয়) আবেদনের ফি: ৫০০ টাকা।প্রসেসিং ফি: অনুমোদিত ঋণের ১%। সর্বোচ্চ: ৬০ মাস।  ১০.১০% ব্যাংকের নামে গাড়ী রেজিস্ট্রেশন হবে। সর্বনিম্ন ২২ থেকে সর্বোচ্চ ৬০ বছর।

সম্পত্তি ঋণ (Property Loan)

বাংলাদেশে বাড়ি বা ফ্ল্যাট কেনার জন্য প্রপার্টি লোন বেশ জনপ্রিয়। আবেদনকারীকে এই ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো সম্পদ বন্ধক রাখতে হয়, অর্থাৎ ব্যাংককে জমির দলিল দিতে হয় এবং তার বদলে ব্যাংক আবেদনকারীকে সেই সম্পত্তির মূল্য অনুযায়ী ঋণ প্রদান করে থাকে। প্রপার্টি লোনের কিছু বৈশিষ্ট্য হলোঃ

  • সম্পদের মূল্যের প্রায় ৪০%-৬০% পর্যন্ত ঋণ পাওয়া যায়।
  • সাধারণত ১৫ বছরের জন্য এই ঋণ প্রদান করা হয়।

বন্ধকী ঋণ (Loan Against Property) 

নিজের স্থাবর যেকোনো সম্পত্তি ব্যংকে জমা রেখে যে লোন নেয়া হয় তাই বন্ধকী ঋণ। তবে শুধু জমি কেনা নয় বরং যেকোনো প্রয়োজনেই এই ঋণ নেয়া যায়। যেমন: ব্যবসায়িক প্রয়োজন, বাড়ি নির্মাণ বা উচ্চশিক্ষার জন্য। অনেকে বন্ধকী ঋণ এবং হোম লোনকে একই মনে করলেও, এই দু’টি আসলে একধরনের ঋণ নয়। 

ক) বন্ধকী ঋণের কিছু বৈশিষ্ট্যঃ

  • সাধারণত বন্ধকী সম্পত্তির ৫০%-৬০% লোন পাওয়া যায়।
  • যেকোনো উদ্দেশ্যেই এই ঋণ পাওয়া যায়।

খ) বন্ধকী ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে আবেদনকারীর যেসব যোগ্যতা থাকা বাধ্যতামূলক তা হলোঃ

  • ৩ বছরের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা
  • বাৎসরিক ২.৪০ কোটি টাকা সেলস টার্নওভার
  • সর্বনিম্ন ১২ মাসের অন-আস (on us) বা অফ-আস (off us) রিপেমেন্ট রেকর্ড

গ) বন্ধকী ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে জরুরী কাগজপত্রসমূহ:

  • এপ্লিকেশন ফর্ম
  • ট্রেড লাইসেন্স (৩ বছর মেয়াদী)
  • ১২ মাসের ব্যাংক স্টেটমেন্ট
  • আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র বা পাসপোর্ট
  • ইউটিলিটি বিলের কাগজ
  • টিন সার্টিফিকেট
  • সম্পত্তি সংক্রান্ত সকল প্রকার বৈধ দলিল পত্রাদি

ঋণ পরিশোধের পর সম্পত্তির কাগজপত্র এবং জমির মালিকানা পুনরায় ফেরত পাওয়া যায়। প্রতারণার সুযোগ এখানে নেই বললেই চলে।

নন সিকিউরড ঋণ

যে লোনের ক্ষেত্রে কোনো জামানত বা সিকিউরিটি রাখা হয় না তাই নন সিকিউরড লোন। মূলত ঋণ আবেদনকারীর ক্রেডিট স্কোরের ওপর ভিত্তি করেই এ লোন দেয়া হয়। সাধারণত ক্রেডিট স্কোর হলো আপনার আগের ঋণ (যদি থাকে) এর সারমর্ম। সেই ঋণ আপনি সঠিকভাবে পরিশোধ করছেন কিনা, পরিশোধে দেরি হয়েছে কিনা, এভাবে ঋণের সার্বিক প্রোফাইল নিয়ে ক্রেডিট স্কোর তৈরি করা হয়ে থাকে। নন-সিকিউরড লোনগুলো হলোঃ

ব্যক্তিগত ঋণ (Personal Loan)

ব্যক্তিগত যেকোনো প্রয়োজনে পার্সোনাল লোন নেয়া যায়। তবে এখানে সুদের পরিমাণ কিছুটা বেশি হয়ে থাকে। এই লোনটি আমাদের দেশে বেশ জনপ্রিয়। বাড়ি করা, গাড়ি কেনা, বা পড়াশোনা যেকোনো দরকারেই এধরনের লোন নেয়া যায়। আবার অনেকে ট্যুরে যাওয়ার জন্য কিংবা গৃহস্থালী জিনিসপত্র কেনার জন্যও এধরনের ঋণ নিয়ে থাকেন। এক্ষেত্রেও আবেদনকারীর ক্রেডিট স্কোর অনুযায়ী লোন দেয়া হয়। ব্যক্তিগত ঋণের কিছু বৈশিষ্ট্য হলোঃ

ক) ব্যক্তিগত ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে তেমন কোনো ডকুমেন্টের প্রয়োজন পড়ে না। অল্প কিছু কাগজপত্র জমা দিয়েই ব্যক্তিগত ঋণের আদেন করা যায়। সেগুলো হলোঃ

  • জাতীয় পরিচয়পত্র
  • পাসপোর্ট সাইজ ছবি
  • ই-টিন সার্টিফিকেট (যদি থাকে)
  • পার্সোনাল গ্যারান্টি (৫ লাখ টাকা অবধি)
  • স্যালারি সার্টিফিকেট বা পে-স্লিপ
  • ব্যাংক স্টেটমেন্ট

খ) এতে সুদের হার বেশি।

গ) সাধারণত ৫ বছর মেয়াদী লোন দেয়া হয়।

ঘ) আবেদনকারীর যোগ্যতা

  • সর্বনিম্ন মাসিক আয় ২৬,০০০ টাকা (বেতনভোগী কর্মকর্তা) থেকে ৫৫,০০০ টাকা (ব্যবসায়ী) হতে হবে।
  • আবেদনকারীকে বাংলাদেশী নাগরিক হতে হবে।

ব্যক্তিগত ঋনের সারমর্মঃ 

ঋণ সীমা চার্জ সমূহ মেয়াদ সুদের হার আবেনকারীর
বয়স
সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা আবেদনের ফি: ৫০০ টাকা।

প্রসেসিং ফি: অনুমোদিত ঋণের ১%।

সর্বোচ্চ: ৬০ মাস।  ১০.১০% বেতনভোগী আবেনকারীর জন্য ২১ বছর

এবং

ব্যবসায়ী আবেদনকারীর জন্য ২৫ বছর।

স্টুডেন্ট লোন (Student loan) 

ইদানীং উচ্চশিক্ষার জন্য লোন নেয়ার চাহিদা খুব বেড়েছে। পূর্বে বাইরের দেশগুলোতে এর প্রচলন থাকলেও বর্তমানে বাংলাদেশেও এধরনের লোনের ব্যবস্থা রয়েছে। দেশের বাইরে পড়াশোনার জন্য অনেকেই এখন ব্যাংক থেকে স্টুডেন্ট লোন নিচ্ছেন। এমনকি আমাদের দেশের শিক্ষার ব্যয়ও ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে গুনতে হচ্ছে লাখ লাখ টাকা। তবে শুধু ‍শিক্ষার পেছনে এতো বড় খরচ যোগানোর সামর্থ্য হয়তো সবার থাকে না। সেসব শিক্ষার্থীদের কথা ভেবেই ব্যাংকগুলো দিচ্ছে সহজ শর্তে স্টুডেন্ট লোন। 

বাংলাদেশে স্টুডেন্ট লোন পাওয়ার উপায়:

  • শিক্ষা ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে প্রতিটা ব্যাংকেরই নিজস্ব কিছু মানদন্ড থাকে, যেমন: আবেদনকারীর পিতা-মাতার আয় বা আমানত আছে কিনা ইত্যাদি। যে ব্যাংক থেকে আপনি লোনটি নিতে চান সেই ব্যাংকের ওয়েবসাইটেই এসব বিষয়ে বিস্তারিত সব তথ্যই দেয়া থাকে।
  • আবেদনকারীকে অবশ্যই এই ঋণের শর্তাবলী এবং EMI  সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখতে হবে।

স্টুডেন্ট লোনের সারমর্মঃ 

ঋণ সীমা চার্জ সমূহ মেয়াদ সুদের হার
৫ লক্ষ থেকে ২০ লক্ষ আবেদনের ফি: ৫০০ টাকা।

সার্ভিস চার্জ: ৫% 

(চাকরি পাওয়ার পর শিক্ষার্থীকে পরিশোধ করতে হবে।)

সর্বোচ্চ: ৬০ মাস।  ৯% – ১২%

ক্রেডিট কার্ড ঋণ (Credit cards)

আমাদের সবারই ক্রেডিট কার্ডের ব্যাপারে কম-বেশি ধারণা আছে। বস্তুত ক্রেডিট কার্ডও একধরনের লোন ব্যবস্থা। এটি এমন একটি কার্ড যার সাহায্যে ব্যাংক থেকে তাৎক্ষণিক লোনের মাধ্যমেই ছোট-বড় যেকোনো ধরনের খরচ সামলানো যায়। সাধারণত ব্যাংক, এর ভোক্তাদের ৩০-৪৫ দিনের জন্য এধরনের লোন দিয়ে থাকে। আর এই সময়ের মধ্যে তা পরিশোধ না করা গেলে এধরনের লোনকে ব্যাংক অন্য সব সাধারণ লোনের মতোই বিবেচনা করে থাকে।

ক্রেডিট কার্ড পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র:

  • স্বাক্ষরিত এবং পূর্ণাঙ্গ আবেদনপত্র
  • জাতীয় পরিচয়পত্র
  • ই-টিন সার্টিফিকেট
  • আবেদনকারীর সত্যায়িত ছবি
  • নমিনির ছবি (আবেদনকারী কর্তৃক সত্যায়িত)
  • পূর্ণাঙ্গ সিআইবি ফর্ম (CIB Form) এবং লেটার অফ আন্ডারটেকিং (Letter of Undertaking)
  • ব্যাংক স্টেটমেন্ট 
  • ভিজিটিং কার্ড/অফিস আইডি

বাংলাদেশে ক্রেডিট কার্ডের সুবিধা:

  • ক্রেডিট কার্ডে তুলনামূলক কম সুদে লোন দেয়া হয়।
  • হঠাৎ দামী কিছু কেনার জন্য ক্রেডিট কার্ড একটি ভালো লোন ব্যবস্থা।

এসএমই বা কৃষি ঋণ

ক্ষুদ্র বা কুটির শিল্পের ঋণ অথবা কৃষি ঋণ, এধরনের ঋণের অনেকগুলো ভাগ রয়েছে। শুধু কৃষি ঋণের ব্যাপারে বলতে গেলে বলা যায়, শস্য ঋণ, মৎস ঋণ, পোল্টি ও ডেইরি ঋণ, এ সকল ঋণই কৃষি ঋণের অন্তর্ভুক্ত। যদিও অধিকাংশই এখানে প্রকল্প ভিত্তিক ঋণের আওতাধীন। তবে আপনার ব্যবসায়িক প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতে আপনি মেয়াদি ঋণ বা রিভলবিং লোন নিতে পারেন। এসএমই লোন নেয়ার জন্য আবেদনকারীর যেসকল যোগ্যতা থাকা বাঞ্ছনীয় তা হলোঃ

  • পার্টনারশিপ/প্রাইভেট/প্রোপ্রাইটারশিপ কোম্পানি হতে হবে।
  • অন্তত ১ বছরের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
  • অবশ্যই ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে লোন আবেদন করতে হবে (মাইক্রো/ছোট বা মাঝারী এন্টারপ্রাইজ)।

এসএমই বা কৃষি লোনের সারমর্মঃ 

ঋণ সীমা চার্জ সমূহ মেয়াদ সুদের হার আবেনকারীর
বয়স
সর্বনিম্ন ২ লাখ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১৫ কোটি টাকা।  আবেদনের ফি: ৫০০ টাকা। প্রসেসিং ফি: অনুমোদিত ঋণের ১%। মেয়াদি ঋণের ক্ষেত্রে: সর্ব্বোচ্চ পাঁচ বছর এবং রিভলবিং ঋণের মেয়াদ: ১ বছর ১০.১০% ২১ থেকে ৭০বছর অবধি।

কর্পোরেট ঋণ

দীর্ঘ, মধ্য ও স্বল্পমেয়াদী যেকোনো প্রকল্পের জন্য বড় পরিসরে কর্পোরেট ব্যাংকিং লোন প্রদান করা হয়। তবে ঋণগুলো নেয়ার ক্ষেত্রে অবশ্যই বিভিন্ন শর্ত প্রযোজ্য থাকে। নতুন উদ্যোক্তাদের পূঁজি বা শ্রম প্রকল্পে কিংবা চলতি প্রকল্পের জন্য প্রদান করা ঋণগুলোই সবার কাছে বেশি পরিচিত। সাধারণত ব্যাংকগুলো প্রজেক্ট ফিন্যান্স-এর আওতায় যে ঋণ প্রদান করে সেগুলো হলোঃ

) টার্ম লোন – যন্ত্রপাতি/নির্মাণ

) মেয়াদী ঋণ – নির্মাণ

) বৈদেশিক মুদ্রা ঋণ

টার্ম লোন সম্পর্কে বিস্তারিত:

যাদের ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের যন্ত্রপাতি কেনা, স্থায়ী বা অস্থায়ী যেকোনো সম্পত্তি কেনার জন্য নগদ অর্থের প্রয়োজন হয়, তাদেরকেই সাধারনত টার্ম লোন দেয়া হয়। কিছু কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আবার মাসিক ভিত্তিতেও এধরনের লোন নিয়ে থাকে। তাই বর্তমানে অধিকাংশ ব্যাংক সহজ শর্তে টার্ম লোন প্রদান করে থাকে। টার্ম লোনের কিছু বৈশিষ্ঠ্য:

  • সহজ আবেদন প্রক্রিয়া।
  • নগদ অর্থ পাওয়ার সুবিধা।
  • সর্বনিম্ন সুদের হার।

টার্ম লোন সাধারণত তিন প্রকার। যথা:

ক) স্বল্প-মেয়াদী ঋণ: যে সমস্ত ব্যবসাগুলো ব্যাংকের লোন প্রদানের ক্রেডিট লাইন (নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা) অতিক্রম করতে পারে না তাদের জন্যই স্বল্প-মেয়াদী ঋণের ব্যবস্থা। সাধারণত ১২-১৮ মাসের জন্য এই ঋণ প্রদান করা হয়।

খ) মধ্যমেয়াদী ঋণ: সাধারণত ১-৩ বছরের জন্য এই লোন প্রদান করা হয়, এবং কোম্পানীগুলো মাসে মাসে ইন্সটলমেন্টের মাধ্যমে তা পরিশোধ করে থাকে।

গ) দীর্ঘমেয়াদী ঋণ: সাধারণত ৩-২৫ বছরের জন্য এই লোন দেয়া হয়ে থাকে। কোম্পানিগুলো এধরনের ঋণের ক্ষেত্রে মাসিক বা চার মাস অন্তর অন্তর ঋণ পরিশোধ করে থাকে। তবে কখনো কখনো ডিভিডেন্ড বা কোম্পানির প্রফিট শেয়ারের মাধ্যমেও লোন পরিশোধ করা হয়। 

প্রকল্প ফিন্যান্স (PROJECT FINANCE)

বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো প্রজেক্ট ফিন্যান্সিং (Project Financing)-এর জন্য বিভিন্ন ব্যবসা এবং ইন্ডাস্ট্রিকে লোন প্রদান করে থাকে। নিম্নোক্ত কিছু সেক্টরে (sector) লোন পাওয়া কিছুটা সহজ:-

  • টেক্সটাইল (Textile)
  • রেডী-মেইড গার্মেন্টস (Ready Made Garments)
  • সিমেন্ট (Cement)
  • স্টিল এবং ইঞ্জিনিয়ারিং (Steel & Engineering)
  • পেপার এবং প্যাকেজিং (Paper & Packaging)
  • পাট শিল্প (Jute Industry)
  • টেলিকম এবং মিডিয়া (Telecom, Media)
  • পাওয়ার সেক্টর (Power Sector)
  • গ্লাসওয়্যার (Glassware)
  • ভোজ্য তেল (Edible Oil)
  • শক্তি এবং অবকাঠামো (Energy and Infrastructure)
  • কেমিক্যাল এবং ঔষধপ্রস্তুতকারক কোম্পানি (Chemicals and Pharmaceuticals)
  • নির্মাণ শিল্প (Construction)
  • সোলার এনার্জি (Solar Energy)
  • জাহাজ তৈরী শিল্প (Ship-building)
  • বিমান শিল্প (Aviation)
  • স্বাস্থ্যসেবা (Healthcare)

কার্যকরী মূলধন (WORKING CAPITAL FINANCE)

নতুন যেকোনো প্রকল্পের জন্য কার্যকরী মূলধন অতীব গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে। আমাদের দেশের প্রায় সবগুলো ব্যাংক যেকোনো সেক্টরের ইন্ডাস্ট্রির জন্য এ ধরনের লোন প্রদান করে থাকে। সাধারণত এই সুবিধাকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়: 

  • নন-ফান্ডেড সুবিধা
  • ফান্ডেড সুবিধা

এই দু-ধরনের সুবিধায় আবার কিছু ভাগ রয়েছে। যেমন:

নন-ফান্ডেড সুবিধা (Non – Funded Facilities) ফান্ডেড সুবিধা (Funded Facilities)
  • ক্রেডিট লেটার (Letter of Credit)
  • স্বল্পমেয়াদী লোন (৩,৬ বা ৯ মাস)
  • Cash LC, BTB LC, UPAS, EDF
  • ওভারড্রাফট (ওয়ার্ক অর্ডার বা অন্যান্য)
  • ব্যাংক গ্যারান্টি (Bank Guarantee)
  • ক্যাশ ক্রেডিট (Cash Credit)
  • BB, PG, APG, Payment Guarantee
  • ট্রাস্ট রিসিটের বিপরীতে লোন (LTR)
  • টাইম লোন (Time Loan)

ট্রেড ফিন্যান্স (TRADE FINANCE)

সময়ের সাথে সাথে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের গন্ডি পেরিয়ে পা রাখছে বাইরের দেশেও। আর আধুনিক ব্যাংকিংয়ের একটি বড় অংশ কাজ করছে বৈদেশিক বাণিজ্যে। এরই ধারাবাহিকতায় ব্যাংকগুলো যে সমস্ত পণ্য বা সেবায় লোন প্রদান করছে তা হলোঃ

  • এক্সপোর্ট এল.সি ( Export LC)
  • এক্সপোর্ট বিল (Export Bill)
  • ইম্পোর্ট ফিন্যান্স (Import Finance)
  • ইম্পোর্ট বিল (Import Bill)
  • শিপিং গ্যারান্টি (Shipping guarantee)

শেষ কথা

যে ধরনের ঋণই আপনি নিতে চাননা কেনো, আগে থেকেই ভেবে নেবেন এই ঋণের পুরো অর্থ আপনি সঠিক সময়ে পরিশোধ করতে পারবেন কিনা। তাই ঋণ নেয়ার আগেই আপনার উচিৎ নিজের আর্থিক অবস্থান নিয়ে আরেকটু চিন্তা ভাবনা করে তারপর ঋন নেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। আশা করা যায়, এই নিবন্ধে ঋণ সম্পর্কিত বিস্তারিত আলোচনা থেকে সবদিক বিবেচনা করে ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয়ে আপনি কিছুটা হলেও উপকৃত হবেন। এছাড়াও ঋণ সম্পর্কে আর কোনো প্রশ্ন বা সমস্যা থাকলে এই আর্টিকেলের নিচে কমেন্ট বক্সে কমেন্ট করে আমাদের জানাতে পারেন, আমরা যথাসম্ভব দ্রুত আপনাদের উত্তর দিয়ে আপনার সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করবো।

অনবরত জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী

ঋণ কতো প্রকার ও কী কী?

উত্তরঃ ঋণ প্রধানত দুই প্রকার। সিকিউরড ঋণ এবং নন-সিকিউরড ঋণ। 

ব্যাংক ঋণ কাকে বলে?

উত্তরঃ ব্যাংক কর্তৃক সাধারণ মানুষকে বিভিন্ন প্রয়োজনে যে লোন দেয়া হয় তাই ব্যাংক ঋণ হিসেবে পরিচিত।

সময়ের ভিত্তিতে কৃষি ঋণ কতো প্রকার?

 উত্তরঃ সময়ের ভিত্তিতে কৃষি ঋণ তিন প্রকার। যথা: স্বল্পমেয়াদী, মধ্যমেয়াদী এবং দীর্ঘমেয়াদী।

ক্ষুদ্র ঋণ কী?

উত্তরঃ হতদরিদ্র, স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য সহজ শর্তে যে ঋণ দেয়া হয় তাই ক্ষুদ্র ঋণ

খেলাপি ঋণ কি?

ঋণ পরিশোধের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ঋণের সব কিস্তি ফেরত না দেয়া হলে তাই খেলাপি ঋণ হয়ে যায়

তদারকি ঋণ কি?

সহজ ভাষায় বলতে গেলে তত্ত্বাবধানে থাকা ঋণকে তদারকি ঋণ বলে। এটি একটি ভোক্তা ঋণ।

ঘূর্ণায়মান ঋণ কি?

ব্যাংক, তার গ্রাহকদের নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সর্বোচ্চ যে পরিমাণ ঋণ প্রদান করতে বাধ্য থাকে তাই ঘূর্ণায়মান ঋণ।

রিলেটেড আর্টিকেল গুলো

Back to top button