লাইফ স্টাইলস্বাস্থ্য

ভালো ঘুমের প্রস্তুতির কিছু পরীক্ষিত কৌশল

রাতের একটি নিশ্চিন্ত নিরবচ্ছিন্ন ঘুম আপনার সকাল টাকেই পালটে দিতে পারে। রাতের একটা খুব ভাল ঘুম, আপনার কর্মোদ্দীপনা বাড়িয়ে দেবে কয়েকগুণ। তাই অবশ্যই পর্যাপ্ত ঘুম কখনোই অপ্রয়োজনীয়তা বা বিলাসিতা না। রাতে ভাল ঘুম না হলে কেমন বিরক্ত লাগে তা আমরা সবাই জানি। সুতরাং পর্যাপ্ত ঘুম বরং প্রয়োজনীয়তা। তবে চলুন জেনে নেয়া যাক ছোট ছোট যে সকল কাজ বিরক্তি ভাব দূর করে ভালো ঘুমাতে সহায়তা করবে সেগুলো সম্পর্কে।

সন্ধ্যায় কফি না খাওয়াঃ

ভাল ঘুমের প্রস্তুতি শুরু হয় ঘুমাতে যাওয়ার আগে থেকেই। তাই রাতে খাবার শেষে কফি খাওয়া ভাল হলেও সন্ধ্যার পরে ঘুমের সমস্যা হলে “আরামের কাপ” এড়ানো উচিত। আমরা জানি ক্যাফেইন রাত জাগতে সাহায্য করে এবং এটি মানব শরীরে কমপক্ষে নয় ঘন্টা সক্রিয় থাকতে পারে। সুতরাং ঘুমাতে যাওয়ার অন্তত ছয় ঘন্টা আগে থেকে ক্যাফেইন আছে এমন যেকোন পানীয় গ্রহণ থেকে বিরত থাকুন। কারো যদি কফিতে ঘুমের সমস্যা বেশি হয় তবে দুপুর বারটার পর থেকেই কফি  খাওয়া বাদ দিন। এতে করে সুফল আপনি হাতে-নাতেই পাবেন। তাছাড়া, রাত জাগা নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হলে বয়স বাড়ার সাথে সাথে এ থেকে ফিরে আসা কঠিন হয়ে পড়তে পারে

ক্যামোমিল ফুলের চা পানঃ

ভেষজ চা যে আসলেই অনিদ্রার সমাধান বিজ্ঞানীরা এখনও তা পুরোপুরি নিশ্চিত নন। তবে ক্যামোমিল ফুল থেকে তৈরি ক্যামোমিল চা একটি প্রাকৃতিক ঘুমের ঔষধ যা নিরাপদ এবং স্বাস্থ্যকর। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভাল ঘুমের জন্য দিনে দুই কাপ করে এই চা খেতে পারেন।

সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং ব্যায়ামঃ

ভাল ঘুমের জন্য সঠিক খাদ্যাভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। অনেকে খালিপেটে ঘুমাতে পারেন না। আবার ভরা পেটেও ঘুমাতে যাওয়া নিয়ম নয়। কথায় আছে, ‘আফটার লাঞ্চ রেস্ট ফর হোয়াইল, আফটার ডিনার ওয়াক অ্যা মাইল’। সুতরাং বুঝতেই পারছেন ভরাপেটে ঘুমাতে যাওয়াটা কোন কাজের কথা নয়। বরং খাওয়ার পর একটু হাঁটা-হাঁটি করে বা বিশ্রাম নিয়ে স্নায়ুকে শিথিল করে ঘুমাতে যাওয়া উচিত। ভরাপেটে ঘুমাতে গেলে যে অসুবিধা হতে পারতো ঘুমের এক্ষেত্রে তা আর হবে না। যদি পারেন তবে ঘুমাতে যাওয়ার ঘন্টা চারেক আগে খেয়ে নিন, আর এ সময় পারলে মিষ্টি জাতীয় বা ভারি কোন কিছু খাওয়া থেকে বিরত থাকুন। এতে ঘুম না আসা বা বার বার ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ার মতো সমস্যাগুলো থেকে মুক্তি পাবেন। এছাড়াও সঠিক খাদ্যাভ্যাসের সাথে সাথে পরিমিত ব্যায়ামও ভাল ঘুমের জন্য খুব দরকারি। তবে ঘুমের আগের চার ঘন্টা ব্যায়াম না করাই ভাল। কেননা, এতে করে শরীরে এ্যাড্রিনালিন নামক হরমোন নিঃসৃত হয়। যা কিনা আপনার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। তাছাড়াও পুর্ণ বয়স্ক কারো যদি ঘুমের সমস্যা হয় তবে বিকেল চারটার পর না ঘুমানোই উত্তম। এতে আপনার ভাল ঘুম না হওয়ার সম্ভাবনা অনেকটাই কমে আসবে।

ম্যাগনেসিয়িাম সমৃদ্ধ খাবার খানঃ

মানবদেহে ভরের দিক থেকে সবচেয়ে বেশী পাওয়া ম্যাগনেসিয়াম তথা চকচকে ধূসর বর্ণের এই ধাতু ইমিউন সিস্টেমকে দ্রুত কাজ করায় এবং চাপ কমায়। ম্যাগনেসিয়ামের উপস্থিতি না থাকলে অনিদ্রার মতো সমস্যা সহজেই আক্রমণ করে। তাই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ম্যাগনেসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার যেমন বাদাম,মাছ, মুরগী, কলা এবং শাকসবজি খেলে ঘুম ভালো হয়।

বিছানায় যাওয়ার আগে তিন ঘন্টা ফোন দূরে রাখুনঃ

বিভিন্ন কারণে দিনের পুরোটা সময় জুড়ে মোবাইল ঘাটাঘাটির পর রাতেও ঘুমানোর আগে ফোন ব্যবহারে ঘুমের মারাত্মক ক্ষতি হয়। কারণ স্মার্টফোনের নীল আলো শরীরের মেলাটিন নামক হরমোন উৎপাদনে বিরুপ প্রভাব ফেলে। এই হরমোন মানুষের ঘুম নিয়ন্ত্রণ ও ঘুমের চক্র ঠিক রাখতে ভূমিকা রাখে। তাছাড়া ঘুমানোর আগে মোবাইল ঘাটলে চাপ বাড়ে এবং ঘুমের দেরী হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভাল ঘুম নিশ্চিত করতে বিছানায় যাওয়ার অন্তত তিন ঘন্টা আগে নির্দিষ্ট স্থানে ফোন রেখে তবে ঘুমাতে যাওয়া উচিত।

ঘুমের জন্য তৈরি হয়ে নিনঃ

প্রত্যেক কাজের আগেই যেমন কম-বেশি প্রস্তুতির দরকার হয়, ঠিক তেমনি ঘুমের আগেও ঘুমের জন্য মনকে তৈরি করে নেয়াই প্রাসঙ্গিক। কেননা, খেয়াল করলে দেখবেন, আপনি যদি সত্যিই ক্লান্ত হন এবং বিছানায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকেন তাহলে কিন্তু সাথে সাথেই ঘুম চলে আসে। তবে প্রত্যেকের আবার একইভাবে স্বাভাবিক সময়ে ঘুম নাও আসতে পারে, কারণ কারো কারো ঘুমের সময় আলাদা হয়। সেক্ষেত্রে, যারা বিশেষত রাত জেগে থাকেন তাদের দেহ-ঘড়িকে সঠিক সময়ে বেঁধে আগে-ভাগে ঘুমের জন্য তৈরি করে নিতে হবে। আর তার প্রস্তুতি হিসেবে দিনের বেলা যত বেশি পারা যায় প্রাকৃতিক আলোর মধ্যে কাটানোর চেষ্টা করুন, এবং তা শুরু করুন ঘুম থেকে ওঠার সাথে সাথেই।

ঘুমের আগে স্নায়ুর চাপ কমাতে যা করতে পারেনঃ

ঘুমানোর আগে ঘুমের প্রস্তুতি নিতে এমন কাজ করুন যাতে আমাদের স্নায়বিক চাপ কমে গিয়ে আমাদের শরীর রিল্যাক্স হয়। এতে সহজেই ঘুম আসে, এবং ভাল ঘুম হয়। আমাদের মধ্যে প্রায় অনেকেরই রাতে ঘুমানোর আগে একটু হলেও ফেইসবুকে ঢুঁ মারার অভ্যাস আছে। এটা করার চেয়ে শোয়ার পূর্বে স্পটিফাইয়ে শান্ত গানের একটা প্লেলিস্ট তৈরি করে গান শুনুন। এছাড়াও প্রতিদিন নিজের দেহ ও মনকে চাপমুক্ত করতে হাল্কা গরম পানি দিয়ে স্নান করতে পারেন, ধ্যান বা মেডিটেশন করা যায়। তাছাড়াও নিজের কাছের মানুষের সাথে কথা বলা, ডায়েরি লেখা কিংবা বই পড়তে পারেন। ঘুমানোর আগে আপনি যে কাজই করুন না কেন, নিজের মন এবং দেহকে চাপমুক্ত করে একটি নিরবিচ্ছিন্ন ঘুমই এখানে মূল কথা। সুতরাং যে কাজেই আপনি নিজেকে রিল্যাক্স করতে পারেন তাই করুন এবং নিশ্চিন্তে ঘুমান।

ঘুমের জন্য সঠিক পরিবেশঃ

আপনি শিরোনামটি পড়ে হয়ত ভাবছেন ভাল ঘুমাতে আবার সঠিক পরিবেশ আবার কেমন!! হ্যাঁ, ভাল ঘুমের জন্য ভাল আরামদায়ক বিছানা এবং সঠিক পরিবেশ বেশ গুরুত্বপূর্ণ দুটি বিষয়। বিছানা ভাল ঘুমাতে সাহায্য করে না। আবার এটি নিয়মিত ধুলেও করে না। তবে ভাল বিছানা যেমন রাতের ঘুমকে উৎসাহ দেয় তেমনি ঘুমের জন্য আদর্শ পরিবেশ ভাল ঘুমের ক্ষেত্রে বিশেষ সহায়তা করে। অন্ধকার, স্যাঁতস্যাঁতে, আসবাবপত্রে ঠাঁসা ঘরে ঘুম কখনোই ভাল হয় না। খোলামেলা, আলো-বাতাসপূর্ণ গোছানো ছিমছাম শোবার ঘরই ভাল ঘুমের জন্য আদর্শ। আর ভাল ঘুমের জন্য ঘুমাতে যাওয়া এবং ঘুম থেকে ওঠার একটি নির্দিষ্ট সময় মেনে চলতে পারলে তো কথায় নেই।

শেষ কথাঃ

ভালো ঘুম মস্তিষ্ককে শীতল রাখে। রাতের বেলায় স্বস্তিদায়ক ঘুম, কে দিনে কত ফুরফুরে মেজাজে কাজ করবে তা নিশ্চিত করে। আপনি হয়তো অনেক সফল ব্যাক্তিদের খুবই অল্প ঘুমিয়ে কর্মোক্ষম থাকার কথা শুনে থাকবেন, তবে আসল বাস্তবতাটা হল বেশিরভাগ মানুষই এমনটা করতে সক্ষম নন। ক্রমাগত টানা প্রতিদিনই পাঁচ ঘন্টার কম ঘুম হলে হার্ট এ্যাটাক, স্ট্রোক, ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে এমনকি এতে আয়ুও কমে যায়। তাই রাতে ঘুমানোর আগে অপ্রয়োজনীয় কাজ না করে উপরের নির্দেশনাবলি মেনে চলুন এবং প্রতিরাতে অন্তত সাত থেকে আট ঘন্টার একটি নিবিড় ঘুম নিশ্চিত করুন। আরামসে ঘুমান আর দিনের বেলায় প্রাণখুলে কাজে নেমে পড়ুন।

Related Articles

Back to top button
Close
Close