লাইফ স্টাইলস্বাস্থ্য

রক্তদানের স্বাস্থ্য উপকারিতা 

রক্তদানের উপকারিতা, গুরুত্ব, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং রক্তদাতার অবদানকে সম্মান জানানোর লক্ষ্যে প্রতিবছর জানুয়ারী মাস জাতীয় রক্তদানের মাস এবং ১৪ই জুন সারা বিশ্বব্যাপী জাতীয় রক্তদান দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। নিয়মিত রক্তদান করলে রক্তদাতার ক্যান্সার এবং হিমোক্রোমাটোসিসের ঝুঁকি কমে যায়। রক্তদান লিভার এবং অগ্ন্যাশয়ের ক্ষতির ঝুঁকি হ্রাস করে, কার্ডিওভাসকুলার স্বাস্থ্যের বৃদ্ধি ঘটায় এবং স্থূলতা কমাতে সহায়তা করে। রক্তদান সারা বিশ্ব জুড়ে প্রতিদিন বহু মানুষের জীবন বাঁচায়। ২০১৯ সালে বাংলাদেশ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক জরিপে দেখা যায় যে, প্রতি বছর আমাদের দেশে প্রায় ১৩ লাখ ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন পরে। রক্তদান রক্তদাতা এবং গ্রহিতা উভয়ের স্বাস্থ্যের পক্ষে ভাল। ঝুঁকি এড়াতে হাসপাতাল, ক্লিনিক বা ব্লাড ব্যাঙ্কে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতিতে রক্ত দেওয়া বা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। ট্রান্সফিউশন পরবর্তী যেকোন ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা যেন না হয় এজন্য রক্তদাতাদের রক্তদানের পূর্বে সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা উচিত। রক্ত দান ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা, রক্তপাতজনিত ব্যাধি, ক্যান্সারের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী রক্তাল্পতা, সিকেল সেল অ্যানিমিয়া এবং বংশগত রক্ত অস্বাভাবিকতার চিকিৎসায় সহায়তা করে।

মানুষের রক্ত এখন পর্যন্ত কৃত্রিমভাবে উৎপাদন করা সম্ভব হয়ে উঠেনি; কাজেই মানুষই এর একমাত্র উৎস এবং সে কারণেই রক্তদান করা এবং যাদের এটি প্রয়োজন তাদের সহায়তা করা উচিত। তাছাড়া ভবিষ্যতে আপনার নিজস্ব প্রয়োজনে নিকটস্থ ব্লাড ব্যঙ্কে রক্ত সঞ্চয় করতে পারবেন। তবে এজন্য আপনার গ্রুপের রক্ত ভাল কোনো ব্লাড ব্যাঙ্কে সংরক্ষণ করা আছে কিনা তা নিশ্চিত হয়ে নিন। আর অবশ্যই রক্ত নেয়ার আগে রক্ত দাতার ব্লাড প্রেসার বা রক্তের ইনফেকশন জনিত রোগ আছে কিনা তা অভিজ্ঞ ডাক্তারের দ্বারা পরীক্ষা করে নেবেন। যারা এইডস এবং হেপাটাইটিস জাতীয় রোগের চিকিৎসায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন তাদের কখনই রক্তদান করা উচিত নয়। তাছাড়া যে সকল লোকেরা টিকা গ্রহণ করেছে বা কোনও সার্জারি করেছে অথবা ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, সর্দি এবং ফ্লু হয়েছে তাদের রক্তদানের আগে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। এছাড়াও গর্ভবতী মহিলাদের রক্ত দেওয়ার আগে অবশ্যই বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে পরামর্শ নিতে ভুলবেন না।

আজকে আমরা রক্তদানের উপকারিতা এবং রক্তদান প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানানোর চেষ্টা করবো। 

সূচিপত্রঃ

রক্তদানের ৫টি উপকারিতা

রক্তদানের উপকারিতা

রক্তদান কেবলমাত্র গ্রহীতার জীবনকেই সুন্দর করে তোলে না বরং রক্তদাতারও সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে সহায়তা করে। নীচে রক্তদানের স্বাস্থ্য উপকারিতাগুলো তুলে ধরা হলোঃ

১) রক্তদান হেমোক্রোম্যাটোসিস বা ব্রোঞ্জ ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করে

রক্তদানের অন্যতম একটি স্বাস্থ্য উপকারিতা হলো এটি হিমোক্রোমাটোসিসের ঝুঁকি কমিয়ে দেয়। হিমোক্রোম্যাটোসিস মানুষের এমন একটি স্বাস্থ্যগত অবস্থা যা শরীরে আয়রনের অতিরিক্ত শোষণের কারণে সৃষ্টি হয়। এটি উত্তরাধিকার সূত্রে,  মদ্যপান, রক্তাল্পতা এবং অন্যান্য অসুস্থতার কারণেও হতে পারে। নিয়মিত রক্তদান শরীরে আয়রনের ওভারলোড কমাতে সহায়তা করে। তবে অবশ্যই রক্তদানের পূর্বে চিকিৎসকের দ্বারা দাতার রক্তদানের যোগ্যতার মানদণ্ড পূরণ করবেন।

২) রক্তদান ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়

রক্তদান মরণব্যাধি ক্যান্সারের ঝুঁকি কমিয়ে দেয়। রক্তদানের মাধ্যমে দেহের সংরক্ষিত আয়রন স্বাস্থ্যকর স্তরে বজায় থাকে। তাছাড়া দেহে আয়রনের মাত্রা হ্রাসের সঙ্গে ক্যান্সারের ঝুঁকির মাত্রা সংশ্লিষ্ট।

৩) রক্তদান হার্ট ও লিভার সুস্থ রাখে

রক্তদান শরীরে আয়রন ওভারলোডের কারণে হার্ট ও লিভারের অসুস্থতার ঝুঁকি হ্রাস করতে বেশ উপকারী। আয়রন সমৃদ্ধ ডায়েট গ্রহণের ফলে শরীরে আয়রনের মাত্রা বাড়তে পারে এবং খুব সীমিত অনুপাতই শোষিত হতে পারে, তাই অতিরিক্ত আয়রন হৃদপিণ্ড, লিভার এবং অগ্ন্যাশয়ের মধ্যে জমা হয় এবং পরবর্তীতে সিরোসিস, যকৃতের দূর্বলতা, অগ্ন্যাশয়ের ক্ষতি এবং অনিয়মিত হার্টের প্রভাবের মতো হার্টের অস্বাভাবিকতার ঝুঁকি বাড়ে। এক্ষেত্রে রক্তদান আয়রনের মাত্রা সঠিক রাখতে এবং অন্যান্য অসুস্থতার ঝুঁকি হ্রাস করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

৪) রক্তদান অতিরিক্ত ওজন কমাতে সাহায্য করে

নিয়মিত রক্তদান রক্তদাতার ওজন হ্রাস করে। যারা স্থূলকায় এবং কার্ডিওভাসকুলার রোগ এবং অন্যান্য অসুস্থতার ঝুঁকিতে রয়েছেন তাদের পক্ষে এটি খুব সহায়ক। তবে খুব ঘন ঘন রক্তদান করা উচিত নয়। যে কোনো ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা এড়াতে রক্ত দেওয়ার আগে অবশ্যই ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে নেবেন।

৫) রক্ত কোষ উৎপাদনে সাহায্য করে

রক্তদানের পরে, শরীর রক্তের ক্ষতি পূরণ করতে কাজ করে। রক্তদান নতুন রক্ত কোষের উৎপাদনে সাহায্য করে এবং পরবর্তীতে সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে সহায়তা করে।

রক্তদান প্রক্রিয়া

রক্তদান প্রক্রিয়া

রক্তদানের পরিকল্পনা আগে থেকে করা ভাল। স্বাস্থ্য সংক্রান্ত কোনও সমস্যা বা উদ্বেগ থাকলে রক্ত দেওয়ার আগে ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে নিন। রক্তদানের একসপ্তাহ আগে থেকে স্বাস্থ্যকর ডায়েট মেনে চলুন। রক্তদানের দিন, নিশ্চিত হয়ে নিন যে আপনি খুব ভাল হাইড্রেটেড, তাই প্রচুর পরিমাণে তরল পান করতে থাকুন। রক্তদানের প্রক্রিয়া চলাকালীন রক্তদাতার আরামদায়ক পোশাক পরিধান করা উচিত। তাছাড়া আপনি যদি কোনো চিকিৎসা বা ঔষুধ গ্রহণ করতে থাকেন তাহলে যেখানে আপনি রক্তদান করছেন তা ব্লাড ব্যাংক, ক্লিনিক অথবা হাসপাতালে অবহিত করুন।

শেষ কথা

রক্তদান করলে উপকার বৈ ক্ষতি নাই। নিয়মিত স্বেচ্ছায় রক্তদানের মাধ্যমে নিজের শরীরে বড় কোনো ধরনের রোগ যেমন  হেপাটাইটিস-বি, হেপাটাইটিস-সি, ম্যালেরিয়া সিফিলিস, এইচআইভি আছে কিনা জেনে নিতে পারবেন। তাছাড়া আপনার দেহ থেকে মোট ৭.৫ শতাংশ রক্ত ৩ জন মানুষের জীবন বাঁচাতে এবং তাদের সকলের মুখে হাসি ফুটাতে পারে। তাই রক্ত দিয়ে অন্যের মুখে হাসি ফুটানোর কারণ বনে যান।

রক্তদানের উপকারিতা সম্পর্কে প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নোত্তর

প্রশ্নঃ আমি কতবার রক্তদান করতে পারবো?

উত্তরঃ একবার রক্তদানের পর পরবর্তীতে পুরো রক্ত দিতে রক্তদাতাকে সর্বনিম্ন ৯০ দিন বা ১২ সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হয়। আর পাওয়ার রেড দানের (দ্বিগুন লাল রক্ত কোষ) ক্ষেত্রে অপেক্ষার সময়কাল ১১২ দিন বা ১৬ সপ্তাহ। তবে আপনি যদি কোনও অসুবিধায় ভোগেন তবে রক্তদান এড়িয়ে চলুন এবং রক্তদানের আগে অবশ্যই ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করুন।

প্রশ্নঃ আমি কতটুকু রক্ত দান করতে পারবো?

উত্তরঃ আপনি প্রতি  সপ্তাহ পর এক ব্যাগ বা ৪৫০ মিলি রক্ত দান করতে পারেন। আমেরিকান রেড ক্রসবাংলাদেশের বাঁধন এর মতো সংস্থাগুলো রক্তদান শিবিরের আয়োজন করে যেখানে যে কেউ অংশ নিতে এবং স্বেছায় রক্তদান করতে পারে। এছাড়া আপনি যে কোনও হাসপাতালে গিয়েও রক্ত দান করতে পারবেন।

প্রশ্নঃ রক্তদান করার জন্য আমার বয়স কত হতে হবে?

উত্তরঃ রাষ্ট্রীয় আইন দ্বারা অনুমোদিত হলে সাধারণ রক্ত সরবরাহে রক্ত দেওয়ার জন্য কমপক্ষে ১৮ বছর বা পিতামাতা অথবা অভিভাবকের সম্মতিতে ১৭ বছর বয়সী হতে হবে। তবে রক্তদানে সক্ষম হওয়ার জন্য রক্তদাতার বয়স অবশ্যই ১৮-৪৫ বছর এবং তাদের ওজন ৪৫ কেজির বেশি হতে হবে। একবার রক্তদানের পর যে কোনও সুস্থ ব্যক্তি ৯০ দিনের প্রয়োজনীয় ব্যবধানের পরে রক্ত দান করতে পারেন। এই অপেক্ষার সময় দাতার শরীরে রক্তের স্তরগুলো পূরণ করতে সহায়তা করে।

প্রশ্নঃ আমি অস্থি মজ্জা বা বোন ম্যারো কীভাবে দান করবো?

উত্তরঃ অস্থি মজ্জা দানের ক্ষেত্রে প্রথম পদক্ষেপ হল ম্যারো রেজিস্টার অথবা অস্থি মজ্জা আদান-প্রদানকারী  প্রতিষ্ঠানে আপনার বিবরণ জানিয়ে দিন। যদি কখনও কোনো অনুদানের প্রয়োজন হয় তাহলে ডাক্তাররা মিলে যাওয়া টিস্যু প্রকারটি খুঁজে বের করে আপনার সাথে সহজেই যোগাযোগ করতে পারবে।

প্রশ্নঃ অস্থি ম্যারো দান করার পর পুনরুদ্ধার হতে কতক্ষণ সময় লাগে?

উত্তরঃ অস্থি ম্যারো এবং পিবিএসসি দাতারা ১ থেকে ৭ দিনের মধ্যে কাজ, অফিস এবং অন্যান্য বেশিরভাগ ক্রিয়াকলাপে ফিরে যেতে পারবে। তাছাড়া  আপনি সম্ভবত কয়েক দিনের মধ্যেই স্বাভাবিক রুটিনে ফিরে আসতে সক্ষম হবেন এবং আপনার মজ্জা কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই স্বাভাবিক স্তরে ফিরে আসবে। এছাড়া আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ব্যক্তি এবং দানের ধরণের উপর নির্ভর করে অস্থি মজ্জা বা বোন ম্যারো দাতার পুনরুদ্ধারের সময়গুলো ভিন্ন হয়ে থাকে।

প্রশ্নঃ কে রক্ত দান করতে পারে না?

উত্তরঃ ১৮ বছরের কম এবং ৪৫ বছরের বেশি বয়সী ও ১১০ পাউন্ডের বা ৪৫ কেজি ওজনের কম ব্যক্তিরা রক্ত দান করতে পারে না। তাছাড়া সক্রিয় সংক্রমণ, তীব্র সংক্রমণ বা এইচআইভি এইডসের মতো রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত দেওয়া ঠিক নয়। রক্তদান করতে যাওয়ার আগে চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ এবং চিকিৎসা বিষয়ক প্রয়োজনীয় তথ্যাবলি জেনে নেবেন।

এছারাও নিয়মিত স্বাস্থ্য বিষয়ক টিপস পেতে চোখ রাখুন আমাদের ওয়েবসাইটে এবং ফেইসবুক পেইজে। 

 

ছবি ও তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button