কম্পিউটিং

বাংলা টাইপিং শেখার সহজ উপায়

তথ্য প্রযুক্তির যুগে টাইপিং শব্দটির সাথে আমরা ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। কম্পিউটার আসার পর আমরা টাইপিং শব্দটির সাথে পরিচিত হই। নানা ভাষাতেই টাইপ করা যায় এর মধ্যে ইংরেজি আর বাংলা টাইপিং এ দেশে বেশি প্রচলিত। আগে বাংলায় টাইপিং তুলনামূলক কম দরকার হলেও বর্তমানে এর পরিসর এবং জনপ্রিয়তা বেড়েছে। পড়া-লেখা ছাড়াও এখন শিক্ষা, গবেষণা, সাহিত্য, ইতিহাস, ঐতিহ্যের চর্চায় মিলেমিশে আছে বাংলা। সময়ের সাথে সাথে বাংলার প্রচার, প্রসার এবং ব্যবহার বেড়েছে অনেকখানি। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বাংলা চর্চা সহজ হয়ে উঠেছে। জনপ্রিয়তা পেয়েছে বাংলা টাইপিং। নিজেদের প্রয়োজনে বর্তমানে মোটামুটি অনেক কাজেই বাংলায় টাইপ করা হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো আমরা ইংরেজি টাইপিংয়ে যতোটা স্বচ্ছন্দ্য, সে তুলনায় বাংলা টাইপিং এ অনেক পিছিয়ে আছি। আমরা এই আর্টিকেলের মাধ্যমে জানবো বাংলা টাইপিং করার কিছু সহজ উপায় সম্পর্কে। 

বাংলা টাইপিং এর উপায়

কি-বোর্ডে ইংরেজি অক্ষরের পাশাপাশি বাংলা অক্ষরও দেখা যায়। বাংলা লেখার জন্য বেশ কিছু সফটওয়্যার রয়েছে। তবে বাংলায় লেখার সেরা ও জনপ্রিয় কিছু কি-বোর্ড রয়েছে। এগুলো হলো-

  • বিজয় কি-বোর্ড
  • অভ্র কি-বোর্ড

জনপ্রিয় এই কি বোর্ড গুলো সম্পর্কে এবং এই কি-বোর্ড দিয়ে কিভাবে টাইপিং করবেন তা সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।

বিজয় কি বোর্ড

সময়ের আলোচিত ও জনপ্রিয় কি-বোর্ডের একটি হলো বিজয় কি-বোর্ড, যাকে আমরা বিজয়-৫২ বলেও জানি। কম্পিউটার ও মোবাইলে কোনো রকম ঝামেলা ছাড়াই ব্যবহারযোগ্য এই সফটওয়্যারটি জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব মোস্তফা জব্বার স্যারের তত্তাবধায়নে  তৈরি করা হয় যা ১৯৮৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর প্রথম অবমুক্ত করা হয়।

বিজয় কি-বোর্ডের সাহায্যে বাংলা স্বাভাবিক শব্দের পাশাপাশি যুক্তাক্ষর যুক্ত বাংলা শব্দও লেখা যায়। অন্যান্য কি-বোর্ডে যুক্তাক্ষর যুক্ত শব্দ লিখতে বেশ ঝামেলা পোহাতে হলেও বিজয় কি-বোর্ড এই ঝামেলা থেকে নিস্তার দিয়েছে। 

অফিস আদালতে বাংলা লেখার জন্য2 অন্যান্য কি-বোর্ডের তুলনায় বিজয় কি-বোর্ডের গ্রহণযোগ্যতা বেশি। বিভিন্ন অফিসিয়াল কাজ থেকে শুরু করে বাংলা লেখার জন্য প্রায় সবক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হচ্ছে বিজয় কি-বোর্ড। বিজয় কি-বোর্ডের ফন্টগুলো এমনভাবে সাজানো যে  আমরা সহজেই অফিসিয়াল কাজ থেকে শুরু করে ব্লগিং, ম্যাসেজিংসহ সব ধরণের কাজকর্ম করতে পারবো।

বিজয় কি-বোর্ডে বাংলা টাইপ

বিজয় কি-বোর্ড আমরা অনেকে চিনে থাকলেও এই কি-বোর্ডের মাধ্যমে কিভাবে টাইপ করতে হয় সে সম্পর্কে অনেকেরই তেমন ধারণা নেই।

বিজয় কি-বোর্ড দিয়ে বাংলা লেখার জন্য দু’টো পন্থা রয়েছে। যা Bijoy Classic ও Unicode নামে পরিচিত। বাংলা লেখার ক্ষেত্রে ফন্ট বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। জনপ্রিয় কিছু বাংলা ফন্ট-এর মধ্যে অধিক জনপ্রিয় ফন্ট হলো Sutonny MJ ফন্ট। 

অফিসিয়াল কাজে ফন্ট নির্বাচনের ক্ষেত্রে Ctrl+Alt+B একত্রে চাপলে Sutonny MJ ফন্ট চালু হয়। অফিসিয়াল কাজসহ বিভিন্ন টাইপিং-এর কাজেই এটি ব্যবহার করা হয়। মূলত এটাই Bijoy Classic. 

অন্যদিকে অফিসিয়াল কাজ ব্যতিত ইন্টারনেটে লেখালিখি, ম্যাসেজিং এসবের ক্ষেত্রে আমরা Sutonny MJ ব্যবহার করি না। এমনকি ডকুমেন্টে Sutonny MJ ফন্টের মাধ্যমে বাংলা টাইপ করে পরবর্তীতে তা কপি করে অনলাইনে কোথাও পেস্ট করলে তখন অনেক ফন্ট ভেঙ্গে গিয়ে অনেক ঝামেলার সৃষ্টি হয়। এই সমস্য এড়িয়ে চলতে Ctrl+Alt+B একত্রে চেপে Nirmala UI ফন্ট নির্বাচন করে ব্যবহার করতে হবে। এটিই Unicode.

অভ্র কি-বোর্ড

বাংলা কি-বোর্ড হিসেবে অভ্র কি-বোর্ড বেশ জনপ্রিয়। ২০০৩ সালের ২৬ মার্চ মেহেদী হাসান এই কি-বোর্ড উন্মুক্ত করেন। বিজয় কি-বোর্ড টাকা দিয়ে কিনতে হলেও অভ্র বিনামূল্যে ব্যবহারের সুযোগ দেয়া হয়েছে শুরু থেকেই।

অভ্র কি-বোর্ডটি দিয়ে সরাসরি বাংলা লিখতে হয়না, ইংরেজিতে লিখলেই তা বাংলায় রুপান্তরিত হয়। যেমন ইংরেজিতে “Dirgho noy mash juddher por bangladesh sadhin hoyeche. ” লিখলে এটা বাংলায় রুপান্তরিত হয় “দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধের পর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। ” তে। তাছাড়া অভ্রতে লিখতে গেলে অভ্রর সাজেশন প্রিভিউ উইন্ডো লিখতেও সহযোগিতা করে।

বাংলায় টাইপিং শেখার উপায়

টাইপিং দ্রুত করতে পারা একটি দক্ষতা। দ্রুত বাংলা টাইপিং-এর জন্য অনেকেই অনেক রকম কোর্স করে থাকেন কিন্তু দিনশেষে ফলাফল শূণ্য! কেননা নিয়মিত চর্চা না করলে দ্রুত বাংলা টাইপ করা সম্ভব না।

দ্রুত বাংলা টাইপিং আয়ত্ত করতে কিছু পদ্ধতি অনুসরণ করা যায়। টাইপিং দক্ষতা বাড়াতে কিছু কার্যকরী বিষয় নিচে তুলে ধরা হলো।

  • বাংলা টাইপিং-এর জন্য আগে কি-বোর্ডের বাংলা বর্ণমালা সম্পর্কে, তাদের অবস্থান সম্পর্কে জানতে হবে।এই কাজে দক্ষতা বাড়াতে নিয়মিত বিভিন্ন পদ্ধতিতে টাইপিং অনুশীলন করতে হবে।
  • প্রতিদিন একটা নির্দিষ্ট সময়ে অনুশীলন করতেই হবে।
  • নিয়মিত অনুশীলনে উন্নতি হচ্ছে কি না তা বুঝতে টাইপিং সফটওয়ার ব্যবহার করে নিজের স্কোর যাচাই করতে হবে।
  • শুরুতে কি-বোর্ড দেখে অনুশীলন করলেও পরবর্তীতে কি-বোর্ড না দেখে স্ক্রিনে তাকিয়ে টাইপ করার দক্ষতা অর্জন করতে হবে।

লক্ষ্য নির্ধারণ করা

বাংলা টাইপিং-এ দক্ষতা অর্জন করার জন্য লক্ষ্য নির্ধারণ করা অতি জরুরী। প্রতিদিন এ কাজে কী পরিমাণ সময় দেবেন তা নির্ধারণ করে নিয়মিত টাইপ করতে হবে।

দ্রুত টাইপিং-এর কৌশল রপ্ত করা

আমরা অনেকেই নতুন কিছু শিখতে গেলে শুরুতে উদ্যমী থাকলেও অনেকেই পরে আর তেমন গুরুত্ব দিতে চান না। যে কারণে অনেকেই চেয়েও পুরোপুরি কাজটা শিখতে পারেন না। দ্রুত টাইপিং শিখতে হলে ক্রমাগত নিয়ম করে অনুশীলনের মানসিকতা থাকতেই হবে।

দ্রুত টাইপিং করতে বাম হাতের কনিষ্ঠা আঙুল A অনামিকা S, মধ্যমা D এবং তর্জনী F ছুঁয়ে রাখতে হবে। বৃদ্ধাঙ্গুল থাকবে স্পেস বার A-এর উপর। আবার ডান হাতের আঙুল গুলোর কনিষ্ঠা J থেকে বৃদ্ধাঙ্গুল স্পেচ বার A পর্যন্ত ছুঁয়ে থাকবে। এভাবে আঙুল উপরে-নিচে লেখার প্রয়োজনে স্থান পরিবর্তন করে আবারও আগের অবস্থানে ফিরে আসবে। এভাবে অনুশীলনের ফলে দ্রুত টাইপিং আয়ত্ত করা সম্ভব।

নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে উন্নতি

বাংলা আমাদের মাতৃভাষা হলেও আমরা অনেকেই বাংলা টাইপিং-এ তেমন দক্ষ না। নিয়মিত অনুশীলনের অভাবই এর মূল কারণ। কোনো কাজে দক্ষতা অর্জন করতে নিয়মিত অনুশীলনের বিকল্প নেই। নিয়মিত অনুশীলনে করতে গেলে অনেক সময় এক ঘেয়েমী কাজ করতে পারে তাই বিরতি নিয়ে কাজ করা উত্তম।

টাইপিং এর জন্য কিছু সফটওয়্যার রয়েছে যা ব্যবহার করে দ্রুত উন্নতি করা সম্ভব। এগুলো হলো-

★Fast Typing Software

★ 10FastFingers.Com

★Typing Master

এগুলো ছাড়া আরো আছে তবে এই সফটওয়্যার গুলোই বেশ জনপ্রিয় টাইপিং সফটওয়্যার যা নিয়মিত ব্যবহার করে দক্ষতা অর্জন করা সম্ভব।

ভালো কি-বোর্ড নির্বাচন

কি-বোর্ড দিয়ে টাইপিং করা হয়। বাজারে বিভিন্ন কোম্পানির বিভিন্ন মানের কি-বোর্ড আছে। কি-বোর্ড কেনার আগে ভালো কি-বোর্ড কেনার বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। যাচাই করে নিজের সুবিধামতো ভালো মানের কি-বোর্ড নির্বাচন করতে হবে। কি-বোর্ড নির্বাচন করতে কিছু বিষয় খেয়াল রাখা জরুরী। এগুলো হলো-

★কি-বোর্ডের বাটন শক্ত কি না কিংবা সহজে টাইপিং উপযোগী কি না খেয়াল রাখা।

★সাজানো আছে কি না সেদিকে নজর রাখা। 

★আঙুল ফিট হয় কি না খেয়াল রাখা

★ফন্টের ধরণ সম্পর্কে অবগত থাকা

★কি-বোর্ডে শর্ট-কাট কি আছে কি না যাচাই করা। 

এসব বিষয় বিবেচনা করে কি-বোর্ড নির্বাচন করলে বাংলা টাইপিং সহজ হবে।

ধৈর্য্যের সাথে কাজ করা এবং বিশ্রাম নেয়া

কোনো কাজ শিখতে হলে অধ্যবসায় এবং ধৈর্যশীল হওয়া জরুরি। তবুও অনেক সময় টানা অনুশীলনে বিরক্তি আসে, কাজ করার ইচ্ছা হারিয়ে যায়। কিন্তু এমনটা করলে আদৌ কিছু শেখা হবে না বরং সময়ের অপচয়।

তাছাড়া দেখা যায় টাইপিং এর সময় প্রচুর ভুল হয়। ভুল হওয়া স্বাভাবিক তবে বেশি ভুল হলে বিরতি নিয়ে ধৈর্যের সাথে কাজ করা উচিত তবেই আসবে সফলতা, বৃদ্ধি পাবে দক্ষতা।

স্ক্রিনে চোখ রেখে টাইপিং

টাইপিং এর ক্ষেত্রে স্ক্রিনে চোখ রেখে করতে হয়। কিন্তু প্রথম প্রথম আমরা কি-বোর্ডে চোখ রেখে টাইপিং করি। শুরুর দিকে বিষয়টা স্বাভাবিক কিন্তু দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে স্ক্রিনে চোখ রেখে টাইপিং এর বিকল্প নেই।

শেষ কথা

অধ্যাবসায়, অনুশীলন, সময়ানুবর্তীতা হলো যে কোনো কাজে দক্ষতা অর্জনের পূর্ব শর্ত। বাংলা টাইপিং এ দক্ষতা অর্জন করতেও এসব গুণাবলীর কোনো বিকল্প নেই। বাংলা টাইপিং শেখার ক্ষেত্রে উপরোক্ত এই কৌশলগুলো আপনাদের বাংলা টাইপিং শেখায় সহযোগিতা করবে আশা রাখি।

রিলেটেড আর্টিকেল গুলো

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button