স্বাস্থ্য

করোনা ভাইরাস কি? প্রতিরোধ এবং প্রতিকারের উপায়।

করোনা ভাইরাস কী?

রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) অনুসারে করোনা ভাইরাস (corona virus) একটি বিশেষ ভাইরাস যা সাধারণ সর্দি হিসাবে শ্বাসকষ্টজনিত অসুস্থতার কারণ হতে পারে। প্রায় সবাই তাদের জীবনের এক পর্যায়ে করোনা ভাইরাস গুলিতে সংক্রামিত হন তবে লক্ষণগুলি সাধারণত হালকা থেকে মাঝারি হয়। কিছু ক্ষেত্রে ভাইরাসগুলি নিম্ন-শ্বসনতন্ত্রের অসুস্থতা যেমন নিউমোনিয়া এবং ব্রঙ্কাইটিস হতে পারে।

এই বিশেষ ধরণের ভাইরাসগুলি বিশ্বব্যাপী পশু-পাখিদের মধ্যে প্রচলিত, তবে এর মধ্যে কেবল কয়েকটি মুষ্টিমেয় মানুষকে প্রভাবিত করে। কদাচিৎ, করোনাভাইরাসগুলি প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে বিবর্তিত হতে পারে এবং ছড়িয়ে দিতে পারে।বিজ্ঞানীদের ভাষ্য মতে, ভাইরাসটি সম্ভবত মানুষের দেহের ভেতরে ইতোমধ্যে ‘মিউটেট করছে’, অর্থাৎ গঠন পরিবর্তন করে নতুন আকার নিচ্ছে এবং সংখ্যাবৃদ্ধি করছে। যার ফলশ্রুতিতে এর ভয়াভয়তা প্রকট আকার ধারন করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করেছেন, এ ভাইরাস একজন মানুষের দেহ থেকে আরেকজন মানুষের দেহে ছড়াতে পারে।

করোনা ভাইরাসের উৎপত্তি:

এই ভয়ানক রোগের স্রবপ্রথাম সূচনা হয় চীনের উহান শহর থেকে । ৩১ ডিসেম্বর এই শহরে নিউমোনিয়ার মতো একটি রোগ ছড়াতে দেখে প্রথম চীনের কর্তৃপক্ষ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে সতর্ক করে। এরপর ১১ জানুয়ারি প্রথম একজনের মৃত্যু হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে সারা বিশ্বে এই পর্যন্ত কয়েক হাজার মানুষ এই ভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছে । যার মধ্যে ২ ভাগ মানুষ মারা গেছে । বিভিন্ন দেশের বিমান বন্দরে ঝুকি এড়াতে স্বাস্থ্য পরীক্ষার বাবস্থা করা হয়েছে ।

করোনা ভাইরাসের লক্ষন:

সাধারণত করোনা ভাইরাসে সংক্রমণের ২ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে এর লক্ষন দেখা দিতে পারে । সর্দি কাশি জ্বর ও শ্বাসকষ্ট দেখা দিবে । এই ভাইরাস মানুষের ফুসফুসে সংক্রমণ ঘটায় এবং শ্বাসযন্ত্রের মাধ্যমে এক জন থেকে অন্য জনের কাছে ছড়িয়ে পড়ে।

  • ক্লান্তি অনুভব করা
  • শ্বাসকষ্ট
  • একটি উচ্চ তাপমাত্রা
  • কাশি এবং / বা গলা ব্যথা

যা থেকে নিউমোনিয়া ও কিডনী অকেজোর হওয়ার মত জটিল সমস্যা দেখা দিতে পারে। তদুপোরি ভাইরাল নিউমোনিয়াকে মহামারির দিকে থেলে দিতে পারে । করোনা ভাইরাসের অনেক প্রজাতি আছে কিন্তু এর মধ্যে মাত্র সাতটি মানব দেহে সংক্রমিত হতে পারে ।

করোনা ভাইরাসের চিকিৎসা ও প্রতিকার:

2019-nCoV সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্য বর্তমানে ভ্যাকসিন এখনও আবিস্কার হয়নি। সংক্রমণ প্রতিরোধের সর্বোত্তম উপায় হ’ল এই ভাইরাসের সংস্পর্শ এড়ানো । সিডিসি সর্বদা শ্বাসযন্ত্রের ভাইরাসের বিস্তার রোধে সহায়তার জন্য দৈনন্দিন প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপের পরামর্শ দেয়।

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের উপশমের কোনও নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। আক্রান্ত ব্যক্তিদের উপসর্গগুলি থেকে মুক্তি দিতে সহায়তামূলক যত্ন নেওয়া উচিত। গুরুতরভাবে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে তাদের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কার্যকারিতার প্রতি যত্নশীল হওয়া অতিব জরুরী।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং চীন গবেষকরা ইতিমধ্যে একটিতে কাজ শুরু করেছেন । তবে কোনও সম্ভাব্য ভ্যাকসিন এক বছর অবধি পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যেই করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকবে। তাই তাদেরকে সর্বচ্চো পরিমাণ সাবধনতা অবলম্বন করার জন্য বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন ।

১। দিনে বার বার সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে।

২। বাইরে থেকে আসার পর কাপড়-চোপড় ভালভাবে সাবান দিয়ে ধুতে হবে ।

৩। বাইরে বের হবার সময় মাস্ক ব্যবহার করতে হবে , প্রয়োজনে ঘরের ভেতরও মাস্ক পরতে হতে পারে ।

৪। বাজারে বিভিন্ন প্রকারের মাস্ক পাওয়া যায় – এর মধ্যে সবচেয়ে বহুল প্রচলিত হল সারজিকেল মাস্ক এবং এইগুলো একবার ব্যবহারের পর ফেলে দিতে হবে । এই মাস্ক ব্যবহারের একটি নির্দিষ্ট নিয়মাবলী আছে । এর দুটি প্রধান অংশ থাকে – এক পাশ রঙ্গিন আর অন্য পাশ সাদা। সাদা অংশটি বাতাস পরিশোধনে ফিল্টারের কাজ করে থাকে। কেউ যদি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হোন তাহলে রঙ্গিন অংশটি বাইরে রাখতে হবে যার ফলে শ্বাসপ্রশ্বাস ফিল্টার হয়ে বাইরে যাবে । আর অন্যদিকে, সুস্থ হলে সাদা অংশটি বাইরে রাখতে হবে, যাতে বাইরের দূষিত বাতাস ফিল্টার হয়ে ভিতরে যাবে । এতে সংক্রমণ এড়ানো যাবে

৫। হাচি বা কাশি দেওয়ার সময় অবশ্যই টিসু দিয়ে মুখ ঢেকে নিতে হবে এবং এর পর টিসুটি ফেলে দিয়ে হাত ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে।

৬। নিজের বা অন্যের নাক, চোখ, বা মুখে হাত দেয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

৭। জ্বর বা কাশি আছে এমন মানুষের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে হবে, আর জ্বরে আক্রান্ত হলে ঘরের ভেতর থাকা উচিত এবং অসুস্থ অবস্থায় বিদেশ যাত্রা থেকে বিরত থাকা উচিত ।

৮। প্রতিদিন এক বা একাধিকবার গোসল করতে হবে এবং।

৯। ফলের রস ও প্রচুর পরিমাণ পানি পান করতে হবে ।

.১০। আপনার বা পরিচিত অন্য কোন ব্যক্তির যদি ঠাণ্ডা জ্বর বা শ্বাসকষ্ট দেখা দেয় তাহলে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

১১। যেসোব এলাকায় করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে সেই এলাকার পশুর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে হবে। আর গেলে পর্যাপ্ত সুরক্ষা নিয়ে তারপর যেতে হবে।

১২। কোন ব্যক্তি অসুস্থ হলে তার মেডিকেল ইতিহাস জানার চেস্টা ক্রুন – তিনি সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশে ভ্রমণ করেছেন কিনা।

১২। কাচা বাজারে যাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে ।

১৩। আপনার চিকিত্সা অ্যাপয়েন্টমেন্টের আগে, স্বাস্থ্যসেবা সরবরাহকারীকে কল করুন এবং তাদের বলুন যে আপনি বা 2019-nCoV সংক্রমণের জন্য মূল্যায়ন করছেন। এটি স্বাস্থ্যসেবা সরবরাহকারীর অফিসটিকে অন্যান্য লোকদের সংক্রামিত হতে না থেকে পদক্ষেপ নিতে সহায়তা করবে।

১৫। কাচা বা আধা- সেদ্ধ খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে, কাচা দুধ, কাচা ডিম , কাচা মাংস ধরার সময় হাত ভালভাবে ধুয়ে নিতে হবে ।

১৬। নিয়মিতভাবে স্পর্শ করা বস্তু এবং পৃষ্ঠগুলিকে পরিষ্কার এবং জীবাণুনাশিত করুন ।

১৭। আপনার বাসায় থাকা অন্যান্য ব্যক্তির সাথে আপনার বাসন, চশমা, কাপ, খাবারের পাত্র, তোয়ালে, বিছানাপত্র বা অন্যান্য জিনিসগুলি ভাগ করা উচিত নয়। এই আইটেমগুলি ব্যবহার করার পরে, আপনার সেগুলি সাবান এবং জল দিয়ে ভালভাবে ধুয়ে নেওয়া উচিত।

১৮। আপনি যখন অন্য লোকের সাথে একই ঘরে থাকবেন এবং যখন আপনি কোনও স্বাস্থ্যসেবা সরবরাহকারীর সাথে যান তখন আপনার ফেসমাস্কটি পরা উচিত। যদি আপনি ফেসমাস্ক পরতে না পারেন তবে আপনার সাথে থাকা লোকেরা আপনার মতো একই ঘরে থাকাকালীন একটি পরা উচিত।

শেষকথা:

নতুন করোনা ভাইরাসগুলির সহজ কোনও নিরাময় নেই – যেমন সাধারণ সর্দি-কাশির কোনও প্রতিকার নেই। তদুপুরি করোনা ভাইরাসের গভীরতা সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা এখনও সামগ্রিক ধারণা অর্জন করতে পারেননি । তাই এই মুহূর্তে সচেতনতাই হতে পারে এর বিরুদ্ধে লড়াই করার মোক্ষম হাতিয়ার । যদিও বাংলাদেশে এখনো এর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়নি তারপর ও ঝুকি এড়াতে সব ধরনের পূর্বপ্রস্তুতি থাকা বাঞ্জনীয় ।

Back to top button
Close